সিলেট, ২১ অক্টোবর: সিলেটে পৈতৃক সম্পত্তি অবৈধভাবে জবরদখল, জাল আমমোক্তারনামা তৈরি করে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাড়ার অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী এক ভাই ও বোন। এসব ঘটনায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার, পৈতৃক সম্পত্তি বুঝিয়ে দেওয়া এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বাংলাদেশ মাল্টিমিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন (বিএমজেএ) সিলেট বিভাগীয় কমিটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন কানাডাপ্রবাসী মো. এহসানুল ইসলাম চৌধুরী ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী তাজিন ইসলাম চৌধুরী।
সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা জানান, তাঁদের প্রয়াত পিতা এনামুল ইসলাম চৌধুরী ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি মারা যান। তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁরা সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকার পৈতৃক সম্পত্তির অংশীদার হন। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের ২৮ মার্চ আইনানুগভাবে নিবন্ধিত একটি বণ্টননামা অনুযায়ী, সুবিদবাজারে অবস্থিত ব্র্যাক ব্যাংক ভবনের অর্ধাংশ এবং পল্লবী কমিউনিটি সেন্টারের জমির অর্ধাংশ তাঁদের প্রাপ্য হিসেবে নির্ধারিত হয়।
তবে প্রবাসে অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তাঁদের ছোট ভাই মুমিনুল ইসলাম চৌধুরী (রিমু), মা বুলবুল নাহার চৌধুরী এবং তাঁদের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করা মাসুক মিয়া ও নওশেবা ফারাহ তুনা ওই সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ করেন এহসানুল ও তাজিন। তাঁদের দাবি, জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া আমমোক্তারনামা তৈরি করে গত পাঁচ বছর ধরে ব্র্যাক ব্যাংকের সুবিদবাজার শাখা থেকে প্রাপ্য ভাড়ার অর্ধাংশ হিসেবে আনুমানিক ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
প্রবাসী ভাই-বোনের দাবি, বিতর্কিত আমমোক্তারনামা তৈরির সময় তাঁরা দুজনই দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের পাসপোর্টের ভ্রমণসংক্রান্ত রেকর্ড দিয়ে বিষয়টি প্রমাণ করা সম্ভব বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন তাঁরা।
এ ঘটনায় বিচার চেয়ে সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সি.আর. মামলা (নং-৪৯৭/২০২৬) দায়ের করেছেন বলে জানান তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালত অভিযোগটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), সিলেটের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বিতর্কিত আমমোক্তারনামা জব্দ এবং বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্বাক্ষর পরীক্ষা করার আদেশও দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, প্রতারণা এড়াতে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল কানাডার টরন্টোতে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের মাধ্যমে তাঁরা সংশ্লিষ্ট জেনারেল পাওয়ার অব অ্যাটর্নি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করেন। এ ছাড়া ৭১/২০১০ নম্বরের একটি অছিয়তনামাকে ভুয়া দাবি করে তাঁরা জানান, গত ৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে সিলেটের যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালত ওই অছিয়তনামার কার্যকারিতা স্থগিত করেছেন।
সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের পাশাপাশি প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। এহসানুল ও তাজিনের ভাষ্য, পৈতৃক সম্পত্তি বণ্টনের দাবি জানানো এবং মামলা দায়েরের জেরে গত ১৫ অক্টোবর রাত আনুমানিক ৮টার দিকে মোবাইল ফোনে তাঁদের সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ইন্টারপোল ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ভয় দেখিয়ে তাঁদের ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
এ ঘটনায় সিলেটের কোতোয়ালী মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১৬০৮, তারিখ: ১৫/১০/২০২৬) করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান প্রবাসী ভাই-বোন।
নিজেদের পরিস্থিতি তুলে ধরে তাঁরা বলেন, “রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রাখলেও আজ নিজ জন্মভূমিতে পৈতৃক সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার, জবরদখল করা জমি ও ভবনের দখল বুঝিয়ে দেওয়া এবং দেশে অবস্থানকালে তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
প্রবাসে ফিরে যাওয়ার পর দেশে তাঁদের সম্পত্তিসংক্রান্ত যাবতীয় কাজের দেখভাল ও তদারকির দায়িত্বে থাকবেন নিযুক্ত প্রতিনিধি মো. আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী ও হাবিবুর রহমান শিবলু বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তবে সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে।
