আজকাল ওয়েবডেস্ক: ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মন্দিরের কাছে গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজনকে কেন্দ্র করে তৈরি বিতর্ক এখন ধর্মীয় অনুভূতি, ক্যাম্পাসের নিয়মকানুন এবং শিক্ষার্থীদের অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার সংক্রান্ত একটি বড় বিবাদে রূপ নিয়েছে। ইসলামি ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের একটি দল আজ, (শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর) দুর্গাপুজোর মহাষষ্ঠীর দিন ক্যাম্পাসের ভেতরে গরু জবাই করার ঘোষণা করেছে। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে পশু জবাই না করার জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল, যা পরবর্তীতে বাতিল করা হয়।
বিবিসি বাংলা এবং দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিবাদের সূত্রপাত হয় সোমবার, ১২ অক্টোবর। সেদিন ইসলামি ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের (২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চের কাছে (যা ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় মন্দিরের খুব কাছে) গরুর মাংস দিয়ে খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করে।
হিন্দু শিক্ষার্থীরা এই স্থান নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং জানান যে, এটি তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব জয় সাহা বিবিসি বাংলাকে জানান, গরুর মাংস রান্না হতে দেখে শিক্ষার্থীরা আয়োজকদের কাছে যান। তিনি বলেন, মন্দিরের এত কাছে এই আয়োজন হওয়ায় তারা কষ্ট পেয়েছেন এবং আয়োজকদের অন্য কোথাও সরে যেতে অনুরোধ করেছিলেন।
এই অনুরোধ ঘিরেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। পরে অধ্যাপক মহ. আজম খান হস্তক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি শান্ত করতে একজন সহকারী প্রক্টরকে পাঠান। এরপর আয়োজকরা মন্দির থেকে আরও দূরে সরে যান এবং জানান যে, কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার কোনও উদ্দেশ্য তাদের ছিল না।
মন্দিরের ইট নিয়ে বিতর্ক
তবে এখানেই ঘটনার শেষ নয়। পরবর্তীতে অভিযোগ ওঠে যে, গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার জন্য অস্থায়ী উনুন তৈরি করতে আয়োজকরা মন্দিরের ইট ব্যবহার করেছিলেন।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যারা এই খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছিলেন, তারা শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়াতেই রান্না করার পরিকল্পনা করেছিলেন। রান্নার গ্যাসের চাপ কম থাকায় পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায় এবং আয়োজকরা অনুষ্ঠানটি বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অনুষ্ঠান আয়োজকদের মতে, অস্থায়ী উনুন তৈরির সময় তারা কাছাকাছি পড়ে থাকা কিছু ইট ব্যবহার করেছিলেন। তখন তারা জানতেন না যে- সেই ইটগুলো ক্যাম্পাসের মধ্যেকার মন্দিরের।
‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরে আয়োজকরা ইটগুলো সরিয়ে ফেলেন, ক্যাফেটেরিয়া থেকে একটি লোহার উনুন নিয়ে আসেন এবং এই ভুল বোঝাবুঝির জন্য ক্ষমা চান। তবে জয় সাহা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, মূল সমস্যাটি ইট নিয়ে ছিল না, বরং মন্দিরের খুব কাছে রান্নার আয়োজন করাটাই ছিল উদ্বেগের বিষয়।
যাই হোক, বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই রাতেই ক্ষুব্ধ হিন্দু শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং মানববন্ধনের আয়োজন করেন। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর সুরক্ষার দাবি জানান। এদিকে, মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রশাসনিক পদক্ষেপ করার আহ্বান জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় মন্দির ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক অজয় পাল।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দু'টি বিজ্ঞপ্তি
১২ই অক্টোবরের ঘটনার রেশ ধরে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৪ই অক্টোবর, বুধবার একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার প্রয়োজনে ক্যাম্পাসের ভেতরে পশু জবাই না করার জন্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের অনুরোধ জানানো হয়।
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিজ্ঞপ্তিতে পশু জবাই ও মাংস নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের একটি গণবিজ্ঞপ্তির উল্লেখ ছিল। বাংলাদেশের ‘পশু জবাই ও মাংসের গুণমান নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১১’ অনুযায়ী, নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে পশু জবাই করা আইনত সীমাবদ্ধ এবং এর লঙ্ঘন দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে।
এই ঘোষণার পর কিছু শিক্ষার্থী আপত্তি জানান। দুই দিন আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষাপটে তারা এটিকে ‘বিফ ফিস্ট’ বা গরুর মাংসের ভোজ আয়োজনের অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ হিসেবে তুলে ধরেন।
অধ্যাপক আজম খান বিবিসি বাংলাকে জানান, পশু জবাইয়ের পরিকল্পনার কথা জানার পরই প্রশাসন এই বিজ্ঞপ্তিটি জারি করেছিল। তিনি বলেন, চলমান ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সময় যাতে কোনও উত্তেজনা না হয়, তা রোধ করতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল।
ওই দিনই পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে দ্বিতীয় একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে বলা হয়, আয়োজনটিকে কেন্দ্র করে যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল, তা প্রক্টরের মধ্যস্থতায় এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনার মাধ্যমে নিরসন করা হয়েছে।
প্রশাসন তাদের আগের বিজ্ঞপ্তির কারণে- ভুল বোঝাবুঝির জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। কর্তৃপক্ষ জানায়, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের যেকোনও অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার রয়েছে। যার মধ্যে পশু জবাই সংক্রান্ত আয়োজনও অন্তর্ভুক্ত। তবে, প্রশাসন সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানায়, যাতে এক পক্ষের কর্মকাণ্ড অন্য পক্ষের জন্য বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের ‘বিফ ফিস্ট’ আয়োজন
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছিল যে, পশু জবাই না করার বিজ্ঞপ্তিটির সাথে ১২ই অক্টোবরের ঘটনার কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু এতেও ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। শিক্ষার্থীরা এখন ১৬ই অক্টোবর, শুক্রবার একটি ‘বিফ ফিস্ট’ বা গরুর মাংসের ভোজ আয়োজনের ঘোষণা করেছেন। তারা একে প্রশাসনের প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদ হিসেবে দেখছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়োজক কমিটির একজন সদস্য বিবিসি বাংলা-কে জানান যে, শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই দুর্গাপুজোর পর এই আয়োজন করার কথা ভেবেছিলেন। তাঁর দাবি, "গরু নিয়ে যেহেতু অনেক ক্ষোভ রয়েছে, তাই আমরা দুর্গাপুজোর পর গরু নিয়ে একটি আয়োজন করার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু প্রশাসন যখন ক্যাম্পাসে গরু জবাই করা যাবে না বলে নোটিশ জারি করল, তখন শিক্ষার্থীরা কষ্ট পেয়েছে।"
ওই আয়োজক জানিয়েছেন যে, অনুষ্ঠান মন্দিরের পাশে না করে সম্ভবত আর্টস ভবনের কাছাকাছি কোনও খোলা মাঠে আয়োজন করা হবে।
বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, আয়োজকরা চাঁদা তুলে একটি গরু কিনেছেন। কট্টরপন্থী ইসলামি দল 'খেলাফত মজলিস'-এর ছাত্র সংগঠন 'বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র মজলিস' আরও একটি গরু দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ঘোষণায় ৭০ টাকা দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের এই ভোজে অংশ নেওয়ার জন্য নাম নথিভুক্তকরণ করতে বলা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলিম আরিফ বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে, ছাত্র প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং অনুষ্ঠানটি আয়োজনের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন।
প্রক্টর আজম খান বলেছেন, যদি গরু জবাই করা হয়, তবে তা যেন সংযতভাবে করা হয়, যাতে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে নতুন করে কোনও বিরোধ তৈরি না হয়।
জয় সাহা বিবিসি বাংলাকে আরও জানিয়েছেন যে, শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের অন্য কোথাও গরু জবাই করলে মন্দির কমিটির কোনও আপত্তি নেই। তবে শর্ত হল, এই কার্যক্রম মন্দিরের সামনে করা যাবে না এবং এর ফলে মন্দিরের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়া চলবে না।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের একে অপরের ধর্মীয় রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং নিশ্চিত করতে বলেছে যেন ক্যাম্পাসের কোনও আয়োজন অন্যদের জন্য বিঘ্ন সৃষ্টি না করে।
