সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র সাংসদেরা। সময় চেয়েছিলেন প্রধান বিচারপতির কাছে। তবে সেই সাক্ষাতের অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি কান্ত। ‘দ্য হিন্দু’র এক প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ‘ইন্ডিয়া’র কোনও প্রতিক্রিয়া এখনও মেলেনি। ফলে এ অবস্থায় ‘ইন্ডিয়া’র প্রতিনিধিদল সুপ্রিম কোর্টে যাবে কি না, বা তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে বিরোধী জোট। তাঁর অপসারণের দাবিতে চাপ তৈরি করছে কেন্দ্রের উপরে। চলতি সপ্তাহে নির্বাচন সদন অভিযানে নেমেছিলেন রাহুল গাঁধী, প্রিয়ঙ্কা গাঁধী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদবেরা। ওই অভিযানে রাহুল-প্রিয়ঙ্কা-সহ অনেকে আটকও হন। শনিবার দিল্লিতে আটক হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সোমবার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার জন্য যে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল তৈরি রেখেছিল ‘ইন্ডিয়া’, তাতে মমতাও ছিলেন। কিন্তু সাক্ষাতের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান হয়ে যাওয়ায় বিরোধী জোট সোমবারের জন্য নতুন করে কোনও কর্মসূচির পরিকল্পনা করে কি না, সে দিকে নজর রাখছে সকলে।
এর আগে গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বিরোধী জোটের নেতারা। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে বেরিয়ে ‘ইন্ডিয়া’র প্রতিনিধিদল জানায়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে তারা সন্তুষ্ট। ওই দিনই রাহুল জানিয়ে দেন, তাঁরা সোমবার প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। রবিবার সন্ধ্যায় সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করেছেন রাহুল গাঁধী। ওই পোস্টে লোকসভার বিরোধী দলনেতা জানিয়েছেন, সোমবারের মিছিলে গোটা ভারত হাঁটবে। রাহুলের কথায়, “দল, লিঙ্গ, জাত, সম্প্রদায়, রাজ্যের ভেদাভেদ সরিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হাঁটব। যুব সম্প্রদায়, সব বিরোধী দল, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, যারা গণতন্ত্র এবং ভারতের সংবিধানের উপর বিশ্বাস রাখে, তারা আমাদের সঙ্গে হাঁটবে।”
রাহুল জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মিছিল করে গিয়ে তাঁরা দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেবেন। সেখানে তিনটি দাবির কথা জানানো হবে। এক, ‘ভোটচুরি’ বন্ধ করা। দুই, এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং তিন, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গেও রবিবার সন্ধ্যায় জানিয়েছিলেন, সোমবার বিকেল ৪টে থেকে ৫টার মধ্যে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করবেন তাঁরা। প্রধান বিচারপতির সিদ্ধান্তের কথা তখনও প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছিল, গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি ভবনে যে প্রতিনিধিদল গিয়েছিল, সোমবারও সেই একই দলকে প্রস্তুত রাখছিল ‘ইন্ডিয়া’। অর্থাৎ, রাহুল ছাড়াও মমতা, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবির সেই প্রতিনিধিদলে থাকার কথা ছিল। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘ইন্ডিয়া’র কী পদক্ষেপ হয়, সে দিকে নজর থাকবে।
অন্য দিকে, রবিবার সাংবাদিক বৈঠক করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-ও। তবে তারা এখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেনি। সোমবার রাহুলদের কর্মসূচিতে সিজেপি-ও শামিল হবে কি না, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। সমাজমাধ্যমে সিজেপি-র তরফে একটি পোস্ট করে বলা হয়েছে, “আরশোলারা (ককরোচ) যারা দিল্লিতে আছ, তারা থেকে যাও। পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হচ্ছে।” একই সঙ্গে লেখা হয়েছে, “যে আরশোলারা দিল্লির বাইরে আছ, তারা নিশ্চয়ই জানো যে, ট্রেন আবার চলছে।” প্রসঙ্গত, শনিবার সিজেপি-র কর্মসূচির মোকাবিলায় দিল্লিমুখী ২৪০টি ট্রেন বাতিল হয়েছিল। রবিবার অবশ্য অধিকাংশ ট্রেনই ফের চালানো হচ্ছে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে ধারাবাহিক ভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে সিজেপি, বিভিন্ন বাম ছাত্র সংগঠন, বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। শনিবারের পর রবিবারও দিনভর দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে দিল্লিতে। চলে ধরপাকড়ও।
শনিবার দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড বসানো হয়, মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা ব্যাহত হয় এবং মেট্রো ও রেল চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ধরপাকড় করা হয় প্রতিবাদীদের। যা নিয়ে রবিবার মামলার শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করলে কাউকে আটক করা যাবে না। তবে প্রতিবাদীদেরও পুলিশি নিয়ম মেনেই প্রতিবাদ করতে হবে।
রবিবার বিশেষ শুনানিতে শীর্ষ আদালত মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা, ব্যারিকেড বসানোর প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা অক্ষুণ্ণ রাখার নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে আইন মেনে মানুষের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বলে আদালত। সুপ্রিম কোর্ট বলে, শান্তিপূর্ণ, নিরস্ত্র জমায়েতের ক্ষেত্রে আইননির্ধারিত পদ্ধতি মেনেই পদক্ষেপ করতে হবে। বিশেষত, ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা যেখানে কার্যকর নয়, সেই এলাকায় এমন জমায়েতের কারণে আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, ‘ঐক্যবদ্ধ’ বিরোধীদের নতুন বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা— এই আবহে সোমবার দিল্লি পুলিশ আরও একবার পরীক্ষায় নামতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
