এক দশকের কাছাকাছি সময় ধরে চলা সৌদি-হুতি সংঘাত এবং সাম্প্রতিক লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক পথকেন্দ্রিক সামরিক উত্তেজনা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। একের পর এক সামরিক পদক্ষেপ, বিমান হামলা কিংবা বিদেশি হস্তক্ষেপ যখন পরিস্থিতিকে শান্ত করার বদলে আরও জটিল করে তুলেছে, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে সংঘাত বাড়াল সমাধান সম্ভব নয়। সামরিক শক্তির প্রদর্শনী বাদ দিয়ে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, মানবিক চাহিদা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সমন্বয়ে একটি সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবায়নযোগ্য পথ খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
বাস্তবসম্মত আলোচনার প্রথম ধাপ হলো সামরিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা। গত এক দশকে বিশ্ব দেখেছে, অত্যাধুনিক বিমানশক্তি বা বহুজাতিক জোট গঠন করেও হুতিদের সামরিকভাবে পুরোপুরি স্তব্ধ করা যায়নি। বরং এই সংঘাত দিন দিন নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাই এই সংকট সমাধানের মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে সরাসরি ও সমন্বিত কূটনৈতিক উদ্যোগে।
সৌদি-হুতি দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দান ও আস্থা তৈরি
ওমানের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে যে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বজায় রয়েছে, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রূপ দিতে হবে। টেকসই সমাধানের জন্য শুরুতেই বড় কোনো রাজনৈতিক চুক্তিতে না গিয়ে ছোট ছোট 'বিশ্বস্ততা বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপ' নেওয়া প্রয়োজন। যেমন-ইয়েমেনের অবরুদ্ধ বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আংশিক শিথিল করা এবং এর বিনিময়ে হুতিদের পক্ষ থেকে সীমান্ত আক্রমণ ও সৌদি তেল অবকাঠামোতে ড্রন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার প্রদান করা।
আরও পড়ুন
ইয়েমেনের সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ ও অর্থনৈতিক সচলতা:
সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণ হলো ইয়েমেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভাজন এবং দীর্ঘকাল ধরে লাখ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বন্ধ থাকা। রিয়াদ ও সান’আর মধ্যে একটি যৌথ অর্থনৈতিক ফান্ড বা নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থ দিয়ে কর্মচারীদের বকেয়া বেতন মেটানোর ফর্মুলা তৈরি করা যেতে পারে। এটি ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কমাবে এবং হুতিদের রাজনৈতিকভাবে নমনীয় করতে পারে।
আরও পড়ুন
লোহিত সাগর সংকটকে গাজা যুদ্ধ ও আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে পৃথকীকরণ
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের হামলা মূলত আঞ্চলিক উত্তেজনারই প্রসারিত রূপ। এটি বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে দুটি সমান্তরাল কৌশলে হাঁটতে হবে। একদিকে, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সহায়তা জোরদার করা, যা হুতিদের লোহিত সাগরে হামলার প্রধান রাজনৈতিক অজুহাতটি নিষ্ক্রিয় করবে। অন্যদিকে, মার্কিন-যুক্তরাজ্য সামরিক জোটের বিমান হামলার বদলে জাতিসংঘ বা নিরপেক্ষ আঞ্চলিক দেশগুলোর (যেমন ওমান ও আলজেরিয়া) মাধ্যমে হুতি নেতৃত্বকে এটি বোঝানো যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পথ নিরাপদ রাখা তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্যও অপরিহার্য।
আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর টেকসই কূটনৈতিক ভারসাম্য
চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া একটি বড় ইতিবাচক মাইলফলক। তবে ইয়েমেন সংকটে এর পূর্ণ সুফল পেতে ইরানকে নিশ্চিত করতে হবে যে তারা হুতিদের কাছে উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ও ড্রন সরবরাহ বন্ধ রাখবে। পাশাপাশি, ইয়েমেনের দক্ষিণ অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং রিয়াদ ও আবুধাবির (সংযুক্ত আরব আমিরাত) মধ্যকার আঞ্চলিক নীতিগত দ্বন্দ্ব দূর করাও একটি স্থিতিশীল সমাধানের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সর্বজনীন রাজনৈতিক সংলাপ
সৌদি-হুতি চুক্তি কেবল একটি বাহ্যিক যুদ্ধবিরতি এনে দেবে, কিন্তু ইয়েমেনের ভেতরের গৃহযুদ্ধ থামাবে না। তাই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে উত্তর ইয়েমেনের হুতি, দক্ষিণাঞ্চলীয় অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি যৌথ ও বিকেন্দ্রীভূত সরকার গঠনের ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন এবং সম্পদে সবার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো শাসনকাঠামো ইয়েমেনে টিকবে না।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলকে রাতারাতি শান্ত করা সহজ নয়। তবে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে যদি সামরিক অবস্থান থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য এবং অভ্যন্তরীণ অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পথ উন্মুক্ত করা যায়, তবেই কেবল সৌদি-হুতি সংঘাতের ইতি টানা এবং লোহিত সাগরে স্বাভাবিক বাণিজ্য প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। ধাপে ধাপে এসব বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বাস্তবায়নই পারে এই দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংকটের স্থায়ী সমাধান আনতে।
