চট্টগ্রাম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে (সওজ) একটি কথিত ও অস্তিত্বহীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘জিরো ট্রেডিং’-এর নামে সরকারি অর্থ লুটপাটের ঘটনা ঘিরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। পোর্ট এক্সপ্রেস সড়কের টোল প্লাজায় ওজন স্কেল সংলগ্ন সংযোগ সড়ক মেরামত (মেইনটেন্যান্স) প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এই অর্থ কেলেঙ্কারির পেছনে সওজ চট্টগ্রামের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এসি) মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরীর সরাসরি সম্পৃক্ততা ও যোগসাজশের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। নথিপত্র জালিয়াতি এবং মাত্র তিন দিনে কাজ শেষ দেখিয়ে ২৫ লাখ২২ হাজার টাকা আত্মসাতের এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানে ফেঁসে যেতে বসেছেন আলোচিত এই প্রকৌশলী।
প্রকল্পের বিস্তারিত নথিপত্র এবং দুদকের সরেজমিন অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম পোর্ট এক্সপ্রেস সড়কের টোল প্লাজায় ওজন স্কেল সংলগ্ন সংযোগ সড়কের মেরামতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাজটি সম্পাদনের জন্য ২০২৫ সালের ১৮ জুন ‘জিরো ট্রেডিং’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ১০ দিন। তবে নথিপত্রে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে মাত্র তিন দিনের মাথায় ২১ জুন কাজ সম্পূর্ণ সম্পন্ন দেখানো হয় এবং ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ২২ জুন প্রতিষ্ঠানটিকে পুরো ২৫ লাখ ২২ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। সরকারি কাজে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া এত দ্রুত সময়ে কাজ সম্পন্ন করা ও বিল উত্তোলন করা শতভাগ অস্বাভাবিক। বাস্তবে প্রকল্পের গুণগত মান ও কাজের পরিমাণ ঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি দেখা গেছে।
ঘটনার ভয়াবহতা উন্মোচিত হয় দুদকের অভিযানের পর। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাঈদ মোহাম্মদ ইমরান হোসেনের নেতৃত্বে একটি টিম রহমতগঞ্জে সওজ অফিসে অভিযান চালায়। অভিযান পরিচালনাকালে প্রকল্পের অনুমোদন, কার্যাদেশ, বিল-ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘জিরো ট্রেডিং’ বাস্তবে সম্পূর্ণ ভুয়া ও অস্তিত্বহীন একটি কাগজসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। একটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সরকারি টেন্ডার অনুমোদন পাওয়া, নথি তৈরি করা, পরিমাপ বই (এমবি) ও গ্রহণ সনদ স্বাক্ষর করা এবং তড়িঘড়ি করে পুরো বিল পরিশোধের প্রতিটি স্তরে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরীর অসাধু ক্ষমতা প্রয়োগ ও প্রভাব নিশ্চিত হওয়া গেছে।
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামকেন্দ্রিক সড়ক অবকাঠামোর প্রতিটি প্রকল্প অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অর্থবহ। পোর্ট এক্সপ্রেস সড়কের মেইনটেন্যান্স কাজের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে জাল কাগজ বানিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা সওজের প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে থাকা একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। ওই সময় নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বহাল থেকে মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর সহযোগীরা মিলে ক্ষমতার অপব্যবহার, বড় বড় প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য ও দুর্নীতির রামরাজত্ব গড়ে তোলেন বলে সওজের নির্ভরযোগ্য সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান চলাকালে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি লিমিটেড টেন্ডারিং মেথড বা এলটিএম-এর মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে বলে দাবি করেন। তবে প্রকল্পের অস্বাভাবিক দ্রুত সমাপ্তি এবং ভুয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশ না করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে অননুমেয় অনুরোধ জানান এবং কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি রফা করার প্রস্তাব দেন। দায়িত্বশীল কোনো প্রকৌশলীর এ ধরনের আচরণ আত্মসাতের অভিযোগের পাল্লাকে আরও ভারী করে তুলেছে।
সংগৃহীত নথিপত্র এবং সরেজমিন প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দুদক ইতিমধ্যে কমিশন কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। জিরো ট্রেডিং কোন প্রক্রিয়ায় এই কাজ পেল, কাজের পরিমাপ বইয়ে জাল সই ছিল কি না, মাঠপর্যায়ে কী পরিমাণ সরঞ্জামের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে এবং প্রাক্কলনে অন্য কোনো কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দুদকের তদন্ত পরিধি বাড়ানো হচ্ছে। এই নথি তদন্তের পূর্ণাঙ্গ চিত্র চূড়ান্ত হলে ভুয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সওজের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরীসহ এই অনিয়ম সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের পথ সুগম হতে যাচ্ছে।
