দেশে নতুন অর্থবছরের শুরুতে বিদেশি ঋণ ও সহায়তার প্রবাহে ভাটা দেখা যচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় বৈদেশিক সহায়তা কমেছে প্রায় ৬২ শতাংশ। এ সময়ে বিদেশ থেকে সহায়তা এসেছে প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে আগের নেওয়া ঋণের আসল পরিশোধে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ডলার। এতে নিট বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ ঋণাত্মক হয়েছে প্রায় ২৭৫ মিলিয়ন ডলার। মূলত উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় কমে যাওয়া এবং আগের নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বাড়ায় বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও অর্থছাড়ের সময়সূচির ওপর বৈদেশিক সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি নির্ভর করে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের অর্থছাড় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অন্যদিকে আগে নেওয়া ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় আসল
ও সুদ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। ফলে একদিকে নতুন অর্থ আসছে কম, অন্যদিকে পুরনো ঋণ শোধে বেশি অর্থ চলে যাচ্ছে। এতে বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণ পরিশোধের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা নিট বৈদেশিক সহায়তাকে ঋণাত্মক ধারায় নামিয়ে এনেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে দেশে মোট বৈদেশিক সহায়তা এসেছে প্রায় ২৯৪ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৬৫ মিলিয়ন ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক সহায়তা কমেছে প্রায় ৬২ শতাংশ। অন্যদিকে, এ দুই মাসে বিদেশি ঋণের আসল পরিশোধের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণের আসল পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সহায়তা কমে যাওয়া এবং ঋণ পরিশোধ বেড়ে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে নিট বৈদেশিক সহায়তা দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২৭৫ দশমিক ২৭ মিলিয়ন ডলারে। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে নিট বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ ছিল ইতিবাচক ২৪৫ দশমিক ১৮ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় নিট প্রবাহ ইতিবাচক অবস্থা থেকে ঋণাত্মক হয়েছে।
কমেছে প্রকল্প সহায়তাও : বৈদেশিক সহায়তার বড় অংশ আসে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রকল্প সহায়তার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ সময়ে প্রকল্প সহায়তা এসেছে প্রায় ২৯৫ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৫৫ মিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রকল্প সহায়তা কমেছে প্রায় ৬২ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে কোনো খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়নি। আগের অর্থবছরের একই সময়ে খাদ্য সহায়তা এসেছিল প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার। ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পাওয়া বৈদেশিক সহায়তার পুরোটাই ছিল প্রকল্প সহায়তা। প্রকল্প সহায়তা কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহেও বড় প্রভাব পড়েছে।
আসল ও সুদ পরিশোধ বেড়েছে : নতুন বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার বিপরীতে পুরনো ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। ইআরডির সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে মোট ৬৯৮ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৬৬৭ দশমিক ১১ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে ঋণের আসল পরিশোধ করা হয়েছে ৫১৬ দশমিক ০৪ মিলিয়ন ডলার এবং সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৮২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে আলোচ্য দুই মাসে বৈদেশিক সহায়তা হিসেবে আসা অর্থের চেয়ে ঋণ পরিশোধে প্রায় ৪০৪ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় হয়েছে। এতে নিট বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে শুধু আসল পরিশোধের তথ্য আছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে যার পরিমাণ ৫৭০ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৫২০ মিলিয়ন ডলার।
বিগত অর্থবছরেও কমেছে : গত অর্থবছরের পুরো সময়েও বৈদেশিক সহায়তা কম আসা এবং ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট বৈদেশিক সহায়তা এসেছে ৭৭২ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৮৫৬ কোটি ৮০ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ কম। এর মধ্যে গত অর্থবছরে প্রকল্প সহায়তা এসেছে ৭৬৭ কোটি ১০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৮৫১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অন্যদিকে, বিদেশি ঋণের আসল পরিশোধ বেড়ে ৩০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ২৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণের আসল পরিশোধ বেড়েছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এতে নিট বৈদেশিক সহায়তা আগের অর্থবছরের ৫৯৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে কমে ৪৭২ কোটি ২০ লাখ ডলারে নেমেছে। অর্থাৎ গত অর্থবছরে বৈদেশিক সহায়তা কমার পাশাপাশি ঋণের আসল পরিশোধ বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিট বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহে।
