প্রায় ৭৫ হাজার বছর আগে বর্তমান ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে বাস করা এক নিয়ান্ডারথাল মানবের নিচের পাটির সামনের এক দাঁত লম্বালম্বিভাবে ফেটে দুভাগ হয়ে গিয়েছিল। দাঁতের অর্ধেক অংশ পড়ে গেলেও তিনি সেটি ব্যবহার করে গেছেন।
সময়ের পরিক্রমায় সেই ভাঙা অংশের ওপর ক্যালসিয়াম জমেছিল ও কামড়ানোর ঘর্ষণে দাঁতের ক্ষয়ে যাওয়া ধারালো অংশটি মসৃণ হয়ে উঠেছিল। যে মারাত্মক জখম বা আঘাত শেষ পর্যন্ত তার প্রাণ কেড়েছিল, তারও অনেক আগে তিনি আরেকটি গুরুতর জখম থেকে বেঁচে ফিরেছিলেন।
মার্কিন বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন ডিসকভার প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘শানিদার এ’ নামে পরিচিত এই নিয়ান্ডারথাল কঙ্কালের অবশিষ্টাংশ থেকে জানা গেছে, তার জীবনকালে ও মৃত্যুর পর অন্য সঙ্গীরা তাকে কীভাবে দেখভাল করতেন।
বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’-এ প্রকাশ পাওয়া নতুন গবেষণায় এমন এক ক্ষতের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যা দেখতে কাঠের বল্লমে তৈরি আঘাতের মতো।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর গবেষকরা বলছেন, এটা সম্ভবত এক হোমিনিন বা প্রাচীন মানবের কাঠের বল্লম দিয়ে অন্য মানবকে হত্যার প্রাচীনতম নজির।
এই ব্যক্তি মৃত্যুর আগে মুখের ওপর এক মারাত্মক আঘাত পেয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন, যা থেকে ইঙ্গিত মেলে, হয়ত দলের অন্য সঙ্গীরা তার যত্ন নিয়েছিলেন। বর্তমান মানবসমাজে যত্ন ও সহিংসতার যে চিত্র দেখা যায়, হাজার হাজার বছর আগে নিয়ান্ডারথালদের জীবনেও ঠিক একই রূপ ছিল।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এমা পোমেরয় বলেছেন, “তারা কারও সন্তান, জীবনসঙ্গী, মা-বাবা বা আত্মীয় ছিলেন। তারা সম্প্রতি মারা গেছেন নাকি হাজার হাজার বছর আগে তা বড় কথা নয়। তাদের কঙ্কাল নিয়ে গবেষণা করতে পারাটা আমাদের জন্য বড় সুযোগ ও সম্মানের।”
এর আগে, ১৯৫০-এর দশকে প্রত্নতাত্ত্বিক রালফ সোলেকির দল শানিদার গুহা থেকে ১০ জন নিয়ান্ডারথালের কঙ্কাল উদ্ধার করেছিল।
এর মধ্যে একজন বয়স্ক পুরুষ ছিলেন, যিনি সম্ভবত এক চোখে দেখতে পেতেন না ও আংশিক বধির ছিলেন। তার ডান হাতটি আংশিক কাটা ও সেটা পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিল।
পাশাপাশি, তিনি বাত ব্যথায় ভুগছিলেন। ওই সময় সোলেকি বলেছিলেন, এ অক্ষম ব্যক্তিটির বেঁচে থাকার ঘটনায় প্রমাণ মেলে, দলের অন্য সদস্যরা নিশ্চিতভাবেই তার সেবা-যত্ন করেছিলেন।
কেমব্রিজের গবেষণা দলটি আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে ২০১৫ সালে পুনরায় সেই গুহায় অনুসন্ধান শুরু করে।
পোমেরয় বলেছেন, নতুন করে আর কোনো কঙ্কাল পাওয়া যাবে এমন প্রত্যাশা তাদের ছিল না। তবে অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তারা উন্মোচন করেন ‘শানিদার এ’কে।
এখানেই শেষ নয়, ‘শানিদার এ’-এর ঠিক ওপরের স্তরে রাখা আরেকটি নিয়ান্ডারথালের কঙ্কাল উদ্ধার করে দলটি, যার নাম ‘শানিদার জেড’।
উদ্ধারকাজের পরিচালক গ্রায়েম বার্কার বলেছেন, এ আবিষ্কার প্রাচীন মানব ইতিহাসের রোমাঞ্চকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।
“এটা সত্যি বিস্ময়কর যে, শানিদার জেড নামের এই নিয়ান্ডারথাল নারী প্রায় ৭৫ হাজার বছর ধরে সেই গুহায় শায়িত ছিলেন। তখনকার দিন থেকে আজ পর্যন্ত মানব ইতিহাসের সব বড় বড় ঘটনা পার হয়ে গেছে, আর আমরা ভাগ্যবান যে তাকে শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছি।”
কাঠের বল্লমের প্রাণঘাতী আঘাত থেকে উদ্ধার
প্রত্নতাত্ত্বিকদের দল যখন ‘শানিদার এ’-এর কঙ্কালের হাড়গুলো উন্মোচন করছিল তখনই তার বাম কাঁধের হাড়ে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে প্রায় ০ দশমিক ৬ ইঞ্চি ব্যাসের একটি প্রায় গোলাকার গর্ত।
মাটি খোঁড়ার কারণে এই গর্ত তৈরি হয়নি। আশপাশের পলিমাটিতে গাছের শিকড় বা মাটির নিচে গর্ত করা পোকামাকড়ের কোনো চিহ্নও ছিল না।
অণুবীক্ষণ যন্ত্র ও সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, হাড়ের ক্ষতটি নিরাময়ের কোনো সুযোগ পাননি ওই নিয়ান্ডারথাল মানব। গর্তের আশপাশ থেকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ফাটল থেকে ইঙ্গিত মেলে, মৃত্যুর ঠিক কাছাকাছি সময়েই হাড়টি ভেঙেছিল।
গর্তের নিচে হাড়ের কয়েকটি টুকরা পড়ে ছিল, যার একটি ভেঙে যাওয়া সেই গর্তের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মেলে। হাড়ের টুকরাগুলোর অবস্থান ও গর্তের ঢালু প্রান্ত বিশ্লেষণ করে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, ধারালো কোনো বস্তু বুক ছিদ্র করে সামনের দিক থেকে সোজা পেছনের দিকে গিয়েছে।
ক্ষতের আকৃতিটি গোল হওয়ায় প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, আঘাতটি করা হয়েছিল কাঠের বল্লম দিয়ে। কারণ পাথরের তৈরি বল্লমের মাথা সাধারণত লম্বাকৃতি বা কোণাকৃতির ক্ষত তৈরি করে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাণঘাতী আঘাতটি ওই নিয়ান্ডারথাল মানবের ফুসফুস ও প্রধান রক্তনালীগুলোকে ফুটো করে দিয়েছিল, যার ফলে দ্রুত তার মৃত্যু হয়।
আঘাতের স্থান ও যে শক্তির ব্যবহারে এই ক্ষত তৈরি হয়েছে তা স্পষ্টতই একটি নিশ্চিত মৃত্যুর উদ্দেশ্যে চালানো হামলাকেই নির্দেশ করে। তবে শিকারের সময়ের কোনো দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকেও পুরোপুরি উড়িয়েও দেওয়া যায় না।
যার মধ্য দিয়ে বেঁচে ছিলেন ‘শানিদার এ’
মৃত্যুর এই ভয়াবহ বল্লমের আঘাতের অনেক আগেই মুখের জখমে ভুগেছিলেন ‘শানিদার এ’। সেই আঘাতের পর খাবার খাওয়া বা মনের ভাব প্রকাশ বা যোগাযোগ করতে তার কষ্ট হত।
গবেষকরা বলছেন, সে সময় দলের অন্য সঙ্গীরাই তার সেবা ও যত্ন করে তাকে সুস্থ করে তুলেছিলেন।
জীবিত সময়ের এ যত্ন ও ভালোবাসা বোধহয় তার মৃত্যুর পরেও অব্যাহত ছিল। মৃত্যুর পর তার দেহটি গুহার ভেতরে বড় এক পাথরের পেছনে পরম যত্নে শুইয়ে রাখা হয়েছিল।
ওই ছোট জায়গাটিতে যেসব নিয়ান্ডারথালের মরদেহ সমাহিত করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ‘শানিদার এ’-ই ছিলেন প্রথম। পরবর্তীতে বারবার একই স্থানে ফিরে এসে প্রিয়জনদের দেহ রেখে দেওয়ার এই চর্চায় প্রমাণ মেলে, স্থানটির সঙ্গে তাদের এক গভীর আবেগনির্ভর টান বা অনুভূতি জড়িয়ে ছিল।
পরবর্তীকালে এক আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও প্লাবনে কঙ্কালের অধিকাংশ অংশ ভেসে গেলেও সেই বড় পাথরটি তার একটি হাতকে রক্ষা করেছিল। হাজার বছর পরও হাতের আঙুলগুলো গাঁট থেকে দুমড়ে-মুচড়ে জড়ো হয়ে রয়েছে।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক এমা পোমেরয় বলেছেন, “শানিদার এ মানব আচরণের ভালো ও মন্দ দুটি দিক, অর্থাৎ, যত্ন ও সহিংসতাকে উন্মোচন করেছে, যা আমরা আমাদের চারপাশের বিশ্বেও দেখতে পাই। এ আবিষ্কার আমাদের দেখায়, বিবর্তনের ইতিহাসে এসব অনুভূতির শিকড় কতটা গভীরে গেঁথে আছে।”
