আপনার মধ্যে একটি স্বর্গীয় অনুভূতি এলো, আপনি সেই অনুভূতির কথাগুলো লিখে ফেললেন—সেটি কি একটি কবিতা হয়ে উঠবে? পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার কবিতা পড়ে কবিতার ফরম্যাট সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা পাই। আবেগের আতিশয্যে প্রেমের, আনন্দের ও দুঃখের অনুভূতিগুলো সেই ফরম্যাটে লিখলেই কি কবিতা হয়ে উঠবে? প্রশ্নটা অন্যভাবেও করা যায়, কেউ যখন তার লেখাটিকে কবিতা বলে দাবি করেন, একজন পাঠক হিসেবে আমি কী করে বুঝব যে, এটি আসলেই একটি কবিতা কি না?
কবিতা এমন একটি ‘উচ্চারণ’ যা বহু বর্ণের ছটায় উদ্ভাসিত। আসুন সেই বর্ণগুলো খুঁজে বের করি। প্রথমত, যে সংক্ষিপ্ত কলেবরের উচ্চারণ শুনে বা পাঠ করে, বুঝে কিংবা না বুঝে ভালো লাগে, সেটি কবিতার উচ্চারণ। যদি না বুঝেই ভালো লাগে তাহলে বুঝবেন, এটি উঁচু মানের কবিতা; এর মধ্যে এমন কিছু আছে যা এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারছি না, কিন্তু পুনঃপুন পাঠে আমি সেই রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারব। অথবা আমি হয়তো বুঝতে পারছি না, কিন্তু কেউ না কেউ তা বুঝতে পারবে। তবে শর্ত হচ্ছে, বুঝতে না পারাটা পাঠকের ভালো লাগতে হবে। কবি শামসুর রাহমান এই বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিতেন। তিনি বলতেন, কবিতার প্রথম লাইনটি এমন হওয়া দরকার, যাতে পাঠকের তা ভালো লাগে। প্রথম লাইনটি হচ্ছে কবিতার দরজা—দরজাটি যদি আকর্ষণীয় হয়, তাহলে পাঠক গৃহাভ্যন্তরে প্রবেশের আগ্রহ বা উদ্দীপনা অনুভব করবে। এ-কারণেই বাংলা ভাষার পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমান প্রথম লাইনটি ভালো লাগার প্রতি এতটা গুরুত্ব দিয়েছেন। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতাটি শুরুই হয়েছে একটি ব্যর্থ প্রেমের হাহাকার দিয়ে—‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটল কেউ কথা রাখেনি।’ লাইনটি পড়লেই পাঠকের জানতে ইচ্ছে করে, কেন কেউ কথা রাখেনি এবং তখন পাঠক এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য কবিতাটির ভেতরে প্রবেশ করে। দরজাটি আকর্ষণীয় ছিল বলেই পাঠক সানন্দে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। একইভাবে হেলাল হাফিজের ‘ফেরিওয়ালা’ কবিতাটির দিকে যদি তাকাই, শুরু হয়েছে—‘কষ্ট নেবে কষ্ট’ এই লাইনটি দিয়ে। পাঠকের সহানুভূতিপ্রবণ মন তখন জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে—কী এমন কষ্টের কথা বলছেন কবি, পড়ে দেখি তো। খুব ভালো একটি কবিতাও প্রথম এক/দুই লাইন আকর্ষণীয় না হওয়ার কারণে বহু পাঠক পাঠবঞ্চিত হতে পারে। অনেকটা সংবাদ নির্মাণের তত্ত্ব ‘ইনভার্টেড পিরামিড’ কাঠামোর মতো—সংবাদের মূল তথ্যটি প্রথম লাইনে পরিবেশন করে, পরে এটির বিস্তারিত বলা। যদি পাঠকের মূল তথ্যটি পছন্দ হয়, তিনি বিস্তারিত জানবেন, পছন্দ না হলে আর ভেতরে ঢুকবেন না।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয়ত, কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছটি পাঠককে পুনঃপাঠের তাগিদ দেবে। একবার পড়েই তৃষ্ণা মিটবে না। হয়তো তখনই নয়, কিছুক্ষণ পরে কিংবা কিছুদিন পরে আবার পড়তে কিংবা শুনতে ইচ্ছে হবে। একটি ভালো কবিতা পাঠক বা শ্রোতাকে পৌনঃপুনিক পাঠের বা শ্রবণের তাগিদ দেয়। কবিতায় যদি রহস্যময়তা থাকে, আধ্যাত্মিক চিন্তার ইঙ্গিত থাকে, যা মূলত চিররহস্যাবৃত, নতুন ধরনের চিত্রকল্প থাকে, তাহলে পাঠক পুনঃপাঠের একটা তাগিদ অনুভব করে। রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা মানুষের একটি অতি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। যুগে যুগে কবিরা ইঙ্গিতধর্মী কবিতা লিখেছেন পাঠকের চিন্তার জলাশয়ে তরঙ্গ তোলার জন্য, যাতে পাঠকের চিন্তার জগৎ সচল হয়; এটি কবিদের একটি বড় কাজ—সামাজিক দায় নেভানো। এভাবেই কবিতা সভ্যতার জার্নিটা নির্মাণ করেছে, ভবিষ্যতেও করবে। বুদ্ধিমান জাতি তাদের রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠানে কবিতা রাখে, কবিদের সম্মানের আসনে বসায়। কারণ কবিরা সম্মানিত হলেই সভ্যতা এগুবে। ক্ষমতাবান ও বিত্তবানরা সম্মানিত হলে পৃথিবীর নৈতিক ও শৈল্পিক আলো বিকশিত হবে না। বিত্ত ও ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ ও অন্ধকারে নিপতিত হয়। বহু কবিতা আছে আমরা প্রথম পাঠে তেমন কিছুই বুঝি না, তাই দ্বিতীয়বার পাঠ করি এবং কখনো কখনো তা বহুবার পাঠ করি। এজরা পাউন্ডের একটি ছোট্ট কবিতা ‘In a Station of the Metro’ এই রকম, ‘The apparition of these faces in the crowd;/ Petals on a wet, black bough.’ মাত্র এই দুই লাইনের কবিতাটিকে বলা হয় পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ ইমেজিস্ট কবিতা। এই লাইন দুটির অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘ভিড়ের মধ্যে এই মুখগুলোর ক্ষণিক আবির্ভাব;/ ভেজা, কালো ডালের ওপর ফুলের পাপড়ি।’ প্রথম পাঠে একটা ধাক্কা লাগে, কিছুই বুঝি না। কিন্তু ভালোও লাগে, বোঝার জন্য আবার পড়তে ইচ্ছে হয়। কয়েকবার পড়ার পর মনে হয়, হয়তো বুঝেছি, তবুও একটা সন্দেহ থেকে যায়; মনে হয়, যদি কবিকে কাছে পেতাম তাহলে জেনে নিতাম, তিনি কেন এই লাইন দুটি লিখলেন। এই আগ্রহটাই নিশ্চিত করে যে এটি একটি কবিতা।
তৃতীয়ত, পঙ্ক্তিগুচ্ছ পাঠ করতে করতে আপনার অন্তরে একটি সংগীত ধ্বনিত হবে, যা অন্য কোনো ধরনের সাহিত্য পাঠে হবে না। যে সংগীত ভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করলে হারিয়ে যায়। এই ধ্বনি কবির মৌলিক সৃষ্টি, এর অনুবাদ হয় না। এজন্যই রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, অনুবাদের মধ্য দিয়ে যা হারিয়ে যায়, তাই কবিতা। এই সংগীত একজন কবির মধ্য প্রাকৃতিকভাবেই বিকশিত হয়। আধুনিক কালে গবেষকেরা এই সংগীতের নাম দিয়েছেন ছন্দ। ছন্দ একটি প্রকৃতিগত বিষয়, তবে অধ্যয়ন ও চর্চার মধ্য দিয়েও তা আয়ত্ত করা সম্ভব। এই অর্জনে হয়তো গবেষণা হয়, কবিতা বোঝার কাজটি সহজ হয়; কিন্তু কবি হয়ে ওঠা যায় না। আমি অনেক ছন্দবিশারদকে দেখেছি তাদের রচিত কবিতাগুলো কবিতা হয়ে ওঠেনি। অথচ তারা অন্যের কবিতার ছন্দগুলো কী অসাধারণ নৈপুণ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। কোথাও মাত্রার হেরফের হলেই ধরে ফেলেন। আমরা স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত এবং অক্ষরবৃত্ত বাংলা ভাষায় রচিত কবিতাগুলো বিশ্লেষণ করে এই তিন ধরনের ছন্দ আবিষ্কার করেছি এবং এই তিন ছন্দের পর্ব বিন্যাসে সৃজনশীলতা প্রয়োগ করে বিভিন্ন কবি তৈরি করেছেন তাদের নিজস্ব সংগীতময়তা। তবে কখনো কখনো এই তিন ছন্দের কোনো সূত্রেই পড়ছে না, কিন্তু শুনতে কী দারুণ লাগছে—এমন কবিতাও দেখা যায়; হয়তো আমাদের গবেষকেরা সেই ছন্দের সূত্র এখনো আবিষ্কার করতে পারেননি। ছন্দ একটি প্রকৃতিগত বিষয়। প্রকৃতির সকল কিছু একটি নির্দিষ্ট ছন্দেই আবর্তিত হয়। গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণে এক চুলও ছন্দপতন নেই, জীবনচক্রেও কি আছে? বৃক্ষের অঙ্কুরোদ্গমে ছন্দ আছে, শিশুর হাঁটায় ছন্দ আছে, ঝড়ের আর্তনাদেও ছন্দ আছে। ছন্দপতন হলেই হাঁটতে থাকা শিশু হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। কবিতা থেকে ছন্দ ছুটে গেলেই সংগীত থেমে যায়, কবিতা পড়ে যায়।
চতুর্থত, এর মধ্যে কী যেন আছে—পাঠকের মনে এই রকম একটা অনুভূতি হবে এবং এই ‘কী যেন’ খোঁজার জন্য পাঠকের মনে অনেক প্রশ্ন দেখা দেবে। পাঠকের মধ্যে একটি অনুসন্ধিৎসা তৈরি হবে। তার বোধ সক্রিয় হয়ে উঠবে। সেই বোধ পাঠককে কোনো মহৎ চিন্তার দিকে ধাবিত করতে পারে। এটিই কবিতার সামাজিক দায়বদ্ধতা। কবির চিন্তাবৃত্ত সক্রিয় পাঠকগোষ্ঠীর মাধ্যমে একটি বৃহত্তর চিন্তাবৃত্ত নির্মাণ করে, যা দেশ ও জাতিকে স্বপ্ন দেখায়। এটি রহস্যময়তারই অংশ, তবে এর চেয়েও আরো গভীর এবং শক্তিশালী। কোনো কোনো কবিতা পরতে পরতে ভাঁজ করে রাখে রহস্যময়তার বীজ। বুদ্ধিমান পাঠক শব্দের স্তর সরিয়ে সেইসব চিন্তাবীজ তুলে আনেন এবং উর্বর মস্তিষ্কে বপন করে উৎপাদন করেন স্বর্ণশস্য। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশক থেকে বাংলা কবিতা আবেগ ও বুদ্ধিমত্তার মধ্যে ভারসাম্য নির্মাণের প্রয়াস চালাচ্ছে এবং সভ্যতা যত এগুচ্ছে, আমাদের জীবন যত জটিল হয়ে উঠছে, কবিতাও ক্রমেই তত বেশি বুদ্ধিবৃত্তিক হয়ে উঠছে, জটিল হয়ে উঠছে। একালের কবিরা নিজের সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে কবিতায় রহস্যময়তা নিষিক্ত করেন, যে কারণে আজকাল কাব্যবোদ্ধাদের বলতে শুনি—লাইনে যা লেখা আছে, তা নয়; বিটুইন দ্য লাইনে যা আছে, সেটিই আসল কবিতা। এই যে ‘বিটুইন দ্য লাইন’, যেখানে কোনো লেখা নেই, কিন্তু লুকোনো আছে বহু কথা—সেটিই হচ্ছে আধুনিক কবিতার প্রাণ, যা কবিতা পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে ‘কী যেন’ একটা খোঁজার তাগিদ দেয়, কবিতাটি বারবার পড়তে উদ্দীপ্ত করে।
পঞ্চমত, এক বা একাধিক দৃশ্য পাঠকের মানসপটে ভেসে উঠবে। কবিতায় উচ্চারিত অস্পষ্ট দৃশ্যকল্পগুলো পাঠকের চিন্তায় ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং বহু পাঠকের কাছে তা ভিন্নতায় সম্প্রসারিত হবে। এ-কারণেই আমরা প্রায়ই বলে থাকি, একটি কবিতা বহু পাঠকের পঠনে বা শ্রবণে বহু কবিতা হয়ে যায়। একবার আমরা কবি শহীদ কাদরীকে তার ‘সঙ্গতি’ কবিতার অর্থ জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, নিজের কবিতা ব্যাখ্যা করতে নেই। কথাটি আমাকে ভাবিয়েছে। অনেক ভেবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, কবি চান বহু পাঠক তার কবিতার ভেতর থেকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বের করুক। কবি তখন দূরে বসে ঈশ্বরের মতো হাসবেন।
এমনই আরো বহুবর্ণের বিভায় উজ্জ্বল পঙ্ক্তিগুচ্ছই একটি সফল কবিতা।
