আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে শতাধিক গুম ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া তদন্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলামের জেরা শুরু হচ্ছে আজ। নিরাপত্তাশঙ্কার কারণে আজ থেকে জিয়াউল আহসানকে কারাগারে রেখেই বিচারকাজ পরিচালনা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করার কথা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হবে। মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসানের পক্ষে জেরায় অংশ নেবেন তার আইনজীবীরা। তার পক্ষে আইনি লড়াই করছেন আইনজীবী সাহিদুর রহমান, নাজনীন নাহারসহ একটি আইনজীবী প্যানেল।
গত ৮ অক্টোবর এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হয়। তৃতীয় দিনের সাক্ষ্যে তিনি সাবেক এই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ তুলে ধরেন। তার জবানবন্দিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পর সেগুলোকে বৈধতা দিতে লোকদেখানো প্রশাসনিক তদন্ত পরিচালনার অভিযোগও ওঠে।
ট্রাইব্যুনালকে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, প্রকৃত অপরাধীদের আড়ালে রাখতেই এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনিক তদন্ত ব্যবহার করা হতো। প্রকৃত মৃত্যুর কারণ গোপন করে মিথ্যা ও ভুল ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং পুলিশ প্রতিবেদন তৈরি করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাধ্য করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব তদন্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃত অপরাধীদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করা।
তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর তাকে জেরার জন্য আজকের দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এর ধারাবাহিকতায় মামলার ১৫তম সাক্ষী রফিকুল ইসলামকে জেরা করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছিল।
এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর মামলার ১৪তম সাক্ষী কামরুল ইসলামের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। একই দিন মামলার ১৩তম সাক্ষী র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর (অব.) সাব্বির রহমানের জেরা শেষ হয়। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, সাব্বির রহমান ছিলেন মামলার সর্বশেষ চাক্ষুষ সাক্ষী।
মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইলে সড়কের পাশে জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের চরদুয়ানী খালসংলগ্ন বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল, মল্লিকসহ ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগেও একই সময়ে তথাকথিত বনদস্যু দমনের আড়ালে আরও ৫০ জনকে হত্যার কথা উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন। অভিযোগ অনুযায়ী, বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এ অভিযোগে মাসুদসহ ৫০ জনের প্রাণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১। একই দিন প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে ২৩ ডিসেম্বর তাকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
