শিক্ষা ডেস্ক: দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর অংশ হিসেবে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি নতুন বই ছাপানোর কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, যার মধ্যে বিষয়বস্তু পরিমার্জনের কাজও চলমান রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের বর্ণনায় যে পরিবর্তন দেখা গেছে, তারই ধারাবাহিকতায় এই নতুন সংযোজন আনা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নতুন এই পাঠ্যক্রমে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোতে বেশ কিছু নতুন তথ্য ও ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্সের কার্যক্রম, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনসংগ্রাম, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা। পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি নিবন্ধও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিহাস ছাড়াও বাংলা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের পরিধি বাড়িয়ে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, কারিগরি শিক্ষা ও আনন্দময় শিক্ষার মতো নতুন কিছু বই অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
গত দেড় দশকে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পাঠ্যবইয়ে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি পড়ানো হতো। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই বর্ণনায় পরিবর্তন এনে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের ঘোষণা এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তাঁর দ্বিতীয়বার ঘোষণার বিষয়টি যুক্ত করা হয়। আর আসন্ন ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন বইয়ে এই বর্ণনা আরও বিস্তৃত করে জিয়াউর রহমানের বিদ্রোহ ও ঘোষণার বিস্তারিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হচ্ছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের বয়ান বদলানোর এই সংস্কৃতি নিয়ে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে। ইতিহাস গবেষক আফসান চৌধুরী মনে করেন, রাজনৈতিক স্বার্থে রাষ্ট্রীয় ইতিহাস পরিবর্তন করার এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের এবং এটি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকতে পারে। তাঁর মতে, পাঠ্যবইয়ে কেবল রাজনীতির চর্চা না করে সমাজের মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার অপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস চর্চায় আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। তবে বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও বিভিন্ন উৎসের মাধ্যমে ইতিহাস সম্পর্কে বহুমুখী ধারণা লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে।
