সৌদি আরবে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বাংলাদেশি নারী সিঁথি আক্তার ওরফে সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে এ খবরের সত্যতা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তার পরিবার। সুইটি বেঁচে আছেন, নাকি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে— এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই পরিবারের সদস্যদের। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে মেয়ের বিষয়ে সঠিক তথ্য চেয়েছেন তার মা জহুরা বেগম।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জহুরা বেগম বলেন, “আমার মেয়ের সঙ্গে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। ১৫ দিন আগে ফোন করে জানিয়েছিল, সে দুই মাস পর বাড়ি ফিরবে। আমার মেয়ের কী হয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার করে কিছু জানি না। বাংলাদেশ সরকারের কাছে জানতে চাই, আমার মেয়ের কী হয়েছে। আমি আমার মেয়েকে ফেরত চাই। জীবিত হোক, মৃত হোক—আমি আমার মেয়েকে চাই।”
দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার বছর আগে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামের বাসিন্দা সুইটি আক্তার সৌদি আরবে যান। মেয়েকে বিদেশে পাঠানোর জন্য দালালের মাধ্যমে দেড় লাখ টাকা ধার করেছিলেন তার বাবা ফজল মিয়া। সৌদি আরবে যাওয়ার পর প্রথম পাঁচ মাস বাড়িতে টাকাও পাঠিয়েছিলেন সুইটি। পরে একদিন ফোন করে পরিবারকে জানান, তাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে।
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, “দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে চাকরির জন্য মেয়েকে পাঠিয়েছিলাম। এ জন্য দেড় লাখ টাকা ধার করেছিলাম। প্রথম পাঁচ মাস সে বাড়িতে টাকাও পাঠিয়েছিল। পরে একদিন ফোন করে জেলে যাওয়ার খবর জানায়।”
তিনি আরো বলেন, “সুইটি জানিয়েছিলেন, মক্কায় কর্মরত অন্য নারীকর্মীদের সঙ্গে ঝগড়ার পর তাকে ফাঁসিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এরপর প্রায় এক বছর তার কোনো খোঁজ পাননি পরিবারের সদস্যরা।”
ফজল মিয়া জানান, “প্রায় ১৫ দিন আগে তার মেয়ে আবার কারাগার থেকে ফোন করেছিলেন। তবে আদালতে তার বিচার বা মামলার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। শেষবার ফোনে সুইটি জানিয়েছিলেন, দুই মাস পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেতে পারেন।”
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর নিয়ে অনিশ্চয়তা
ফজল মিয়া বলেন, “দুই দিন আগে তারা জানতে পারেন, সৌদি সরকার সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কোনো পর্যায় থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি। এখন পর্যন্ত তারা মানুষের মুখে শোনা খবরের ওপরই নির্ভর করছেন।”
তিনি বলেন, “আমার মেয়ের ভাগ্যে কী ঘটেছে, আমরা জানি না। সে বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে, তাও জানি না। আমরা শুধু মানুষের কাছে উড়ো খবর শুনেছি।”
পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি
মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত বিএমইটি কার্ডের তথ্য অনুযায়ী সুইটির বাড়িতে গিয়ে কয়েকজন প্রতিবেশীর উপস্থিতি দেখা যায়। সুইটির বাবা ফজল মিয়া দিনমজুরের কাজ করেন। পাঁচ মেয়ের মধ্যে সুইটি সবার ছোট। মেয়েকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হতে হয়েছিল পরিবারটিকে।
এদিকে, সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। তার বিএমইটি কার্ডে বাবার নাম ফজল মিয়া ও মায়ের নাম জহুরা বেগম উল্লেখ রয়েছে। তবে কার্ডে থাকা নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিচিত ব্যক্তিদের কেউ সিঁথি আক্তার ওরফে সুইটি আক্তারকে শনাক্ত করতে পারেননি বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন, তাদের মেয়ে এখনো সৌদি আরবে বেঁচে আছেন। তবে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ কেউ মনে করছেন, সামাজিক ও ধর্মীয় কারণে পরিবারটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর মেনে নিতে পারছে না। তবে এ ধরনের ধারণার পক্ষে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের কাছে নেই কোনো তথ্য
স্থানীয় মহেড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিভাস সরকার নুপুর এবং মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, “সুইটি আক্তারের বিষয়ে সরকারের কোনো পর্যায় থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি।”
এ অবস্থায় সুইটি আক্তার জীবিত আছেন, নাকি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে— তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। পরিবারের সদস্যরা মেয়ের প্রকৃত অবস্থা জানতে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সঠিক তথ্য ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন।
