বিদেশী কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই নিরপেক্ষতা জরুরি। তাদের বিরুদ্ধে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো, তারা বিপুল মুনাফা বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে পাঠিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু মুনাফা প্রত্যাবাসনকে একা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের ভাবমূর্তি নানা কারণে ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক যোগসাজশে এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীর দুর্নীতি, ঋণ অনিয়ম ও প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেয়ার অভিযোগ বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেলকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রশ্ন উঠছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে মুনাফা করছে, নাকি দুর্বল শাসন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অন্যায্য আয় করছে? বিতর্কের উত্তাপে অবশ্য একটি মৌলিক বিষয় আড়ালে পড়ে যায়: মুনাফা নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হলো মুনাফা অর্জনের পদ্ধতি এবং তার সামাজিক মূল্য।
বাজার অর্থনীতিতে মুনাফা বিনিয়োগ, উদ্ভাবন ও কর্মসংস্থানের প্রণোদনা দেয়। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান লাভ করছে বলেই তাকে অসৎ বলা যায় না। তবে সব মুনাফাও সমানভাবে অর্থনৈতিক কল্যাণ সৃষ্টি করে না। দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে অর্জিত মুনাফা অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়; একচেটিয়া বাজারক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার সুযোগে অর্জিত অন্যায্য মুনাফা প্রতিযোগিতা ও ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে। সুতরাং দেখতে হবে—প্রতিষ্ঠান আইন মানছে কিনা, যথাযথ কর দিচ্ছে কিনা, শ্রমিক ও ভোক্তার অধিকার রক্ষা করছে কিনা এবং অর্থনীতিতে টেকসই অবদান রাখছে কিনা। অন্যায্য কার্যক্রম বন্ধ করতে গিয়ে এমন নীতি নেয়া যাবে না, যা সক্ষম ও সৎ প্রতিষ্ঠানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং অদক্ষ প্রতিষ্ঠানকে অযাচিত সুবিধা দেয়।
বাংলাদেশে কর পরিপালন, আর্থিক বিবরণীতে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ, সরকারি সেবা পেতে ঘুস এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান আয়-সম্পদ গোপন করলে বা অবৈধ সুবিধা নিয়ে ব্যবসা করলে সরকার রাজস্ব হারায় এবং সৎ উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতায় পড়েন। তবে এসব অভিযোগকে সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেয়াও ঠিক নয়; প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, কার্যকর নিরীক্ষা এবং আইন ভঙ্গের প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তরা শাস্তি না পেলে অনিয়ম স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়। পাশাপাশি মুনাফার সামাজিক মূল্যায়নে শুধু করের পরিমাণ নয়, কর্মসংস্থানের মান, স্থানীয় ক্ষুদ্র সরবরাহকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং পরিবেশগত প্রভাবও বিবেচনায় আনা উচিত। করছাড় বা সরকারি প্রণোদনা দেয়া হলে তার বিনিময়ে কী বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান বা উৎপাদনশীলতা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। প্রণোদনা যেন রাজনৈতিক যোগাযোগের পুরস্কার না হয়ে নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত থাকে। অন্যথায় সরকার প্রয়োজনীয় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং অসৎ উপায়ে সুবিধা নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে এগিয়ে যায়। ফলে আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে।
ব্যবসায়ী নেতারা প্রায়ই সুশাসনের ঘাটতির জন্য সরকার, রাজনীতি ও সামগ্রিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেন। এসব কারণ বাস্তব হতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে ব্যবসায়ীদের নিজস্ব দায়িত্ব এড়ানো যায় না। সরকারকে আইনের সমান প্রয়োগ, স্বাধীন ও দক্ষ নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছ সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উচিত নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন, কর পরিপালনে উৎসাহ, ঘুস ও প্রতিযোগিতাবিরোধী আচরণের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং সদস্যদের জবাবদিহি বাড়ানো। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো নির্ভুল হিসাব প্রকাশ, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং ভোক্তার সঙ্গে ন্যায্য আচরণ। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতার পর বাংলাদেশের বেসরকারি খাতকে আর নবীন বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। সুশাসন এখন শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়। দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্বার্থেরও শর্ত।
বিদেশী কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই নিরপেক্ষতা জরুরি। তাদের বিরুদ্ধে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো, তারা বিপুল মুনাফা বৈদেশিক মুদ্রায় দেশে পাঠিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু মুনাফা প্রত্যাবাসনকে একা দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না। বিদেশী বিনিয়োগ নতুন পুঁজি, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, কর ও স্থানীয় সরবরাহ ব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি ও উপকরণ আমদানি, বৈদেশিক ঋণের সুদ-মূলধন পরিশোধ এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। তাই মূল্যায়নে বিনিয়োগের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা প্রভাব ও অর্থনৈতিক অবদান দেখতে হবে। বিনিয়োগকারী মুনাফা করতে চাইবেন, সেটিই স্বাভাবিক। গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি আইন মেনে চলছেন, কর দিচ্ছেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে কতটা মূল্য সংযোজন করছেন। একই সঙ্গে মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিয়ম স্পষ্ট ও ধারাবাহিক হওয়া দরকার, যাতে বৈধ লেনদেন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং অবৈধ অর্থ স্থানান্তরও আড়ালে না পড়ে। তথ্যভিত্তিক তদারকি সন্দেহনির্ভর প্রচারণার চেয়ে কার্যকর।
এটি বিদেশী কোম্পানির পক্ষে সাফাই নয়। দেশী-বিদেশী উভয় প্রতিষ্ঠানের কর পরিপালন, শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশগত দায় এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিয়ম একই মানদণ্ডে যাচাই করা উচিত। বিদেশী বলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অযথা সন্দেহ করা যেমন অনুচিত, তেমনি বিনিয়োগ আনে বলে তাকে জবাবদিহির বাইরে রাখাও ঠিক নয়। সমান আইন প্রয়োগ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায় এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরও ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ দেয়।
দেশের পুঁজিবাজারে সফল কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়ানোও জরুরি। তবে দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে নির্বিচারে শেয়ার ছাড়তে বাধ্য করলেই বাজার শক্তিশালী হবে না। কোম্পানির কাছে তালিকাভুক্তির ব্যয়, তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা, মালিকানার নিয়ন্ত্রণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং বাজারে পর্যাপ্ত তারল্যের অভাব গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। লভ্যাংশের প্রত্যাশিত হারকে ব্যাংক ঋণের সুদহারের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করাও যথাযথ নয়। দুটির ঝুঁকি ও প্রকৃতি আলাদা, বরং দেখতে হবে, পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের নির্ভরযোগ্য সুযোগ দিচ্ছে কিনা এবং বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছ তথ্য ও কার্যকর সুরক্ষা পাচ্ছেন কিনা। পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি অনিয়মের দ্রুত বিচার, সংখ্যালঘু শেয়ারহোল্ডারের অধিকার সুরক্ষা এবং আর্থিক প্রতিবেদন নির্ভরযোগ্য করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। ভালো কোম্পানির জন্য বাজারে আসা যেন শুধু আনুষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতা না হয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও সুনাম অর্জনের বাস্তব সুবিধা তৈরি করে। এক্ষেত্রে করনীতির স্থিতিশীলতা এবং নীতিনির্ধারণে পূর্বানুমানযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রশ্ন শুধু বিদেশী কোম্পানির নয়। স্থানীয় ইস্পাত, সিমেন্ট ও তৈরি পোশাক শিল্পের লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকেই কেন তালিকাভুক্ত হচ্ছে না তা অনুসন্ধান করা দরকার। একইভাবে দেশে ল্যান্ডফোনের সীমিত বিকাশ কিংবা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ছোট ও মাঝারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে অনাগ্রহের পেছনে নীতি, অর্থায়ন, প্রতিযোগিতা ও নিয়ন্ত্রক বাধাগুলো খতিয়ে দেখা উচিত। পাকিস্তান বা অন্য দেশের পুঁজিবাজারের সঙ্গে তুলনা করতে হলে শুধু তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নয়, করনীতি, বিনিয়োগকারীর সুরক্ষা, বাজারের গভীরতা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে মুনাফা অর্জন উৎসাহিত হবে, কিন্তু আইন ভঙ্গ ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেয়া নিরুৎসাহিত হবে। এজন্য কর প্রশাসনের সক্ষমতা, নিরীক্ষার মান, প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার জবাবদিহি এবং সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও আত্মনিয়ন্ত্রণের বাস্তব নজির স্থাপন করতে হবে। শুধু করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের দায়ী করে কিংবা আক্রমণাত্মক নীতি নিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ন্যায্য প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি এবং জনস্বার্থ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হবে না; বরং বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টির ভিত্তি শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশলের লক্ষ্য হওয়া উচিত দায়িত্বশীল ব্যবসা, কার্যকর রাষ্ট্র এবং আস্থাশীল বাজারের মধ্যে একটি টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলা।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের লিড পার্টনার
