কারও মতে তিনি ভার্গব অর্থাৎ ঋষি ভৃগুর সন্তান। সমুদ্রমন্থনে তাঁর পুনর্জন্ম হয়। কোথাও আবার তাঁর সৃষ্টি প্রসঙ্গে উঠে আসে। দূর্বাশা মুনির অভিশাপের কথা। সে সব কথা থাক। ভক্তের কাছে দেবী লক্ষ্মী আদি জগন্মাতা, বিষ্ণুশক্তি, পরমেশ্বরী।
প্রচলিত প্রতিমায় মা লক্ষ্মীর চারটি হাত। চতুর্ভুজা দেবীর ব্যাপ্তি চতুর্দিক জুড়ে। সর্বত্রই তিনি বিরাজমানা। চার হাতে তিনি চতুর্বর্গ ফলপ্রদায়িনী। যে চার হাত যথাক্রমে ধর্ম, কাম, অর্থ ও মোক্ষকে ইঙ্গিত করে।
▪️ ধর্মের অর্থ এক জন মানুষের অবশ্যপালনীয় সামাজিক কর্তব্য। যেমন আর্তের সেবা, দীনের সাহায্য, নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি।
▪️ কামের অর্থ ইচ্ছা। এখানে কামনাকেই কাম হিসেবে বোঝানো হয়েছে। মানুষের কামনা থাকবে, তার নিজের উত্তরোত্তর উন্নয়ন। নিজের অন্তরের শ্রী বৃদ্ধির ইচ্ছা জাগিয়ে তোলাকেই এখানে কাম বলে অভিহিত করা হয়েছে।
▪️অর্থ হল জীবনের লক্ষ্য। বেঁচে থাকার লক্ষ্য কী? শুধুই যাপন? কেন মানুষ এই সমাজে আসেন এবং একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে তিনি বেঁচে থাকেন? সেই লক্ষ্যকে বুঝতে পারা এবং তাকে উপলব্ধির মরমে ধারণ করা হলো অর্থ।
▪️মোক্ষ হল মুক্তি। নিজের লোভ থেকে মুক্তি অর্থাৎ আত্মত্যাগ ও আত্মোপলব্ধি হল মোক্ষ।
চার হাতের মাহাত্ম্য থেকে তাই বোঝা যায় দেবী লক্ষ্মী বাইরের ঐশ্বর্যের পাশাপাশি অন্তরের ঐশ্বর্যও প্রদান করেন। মনে রাখতে হবে তিনি কিন্তু কেবল ঘরকে আলোকিত করছেন না। তিনি আলোকিত করছেন মনের ঘরটিও, যেটি সবচেয়ে অন্ধকার। দেবী এসে বলছেন, কে জেগে আছো…। অর্থাৎ, ঐশ্বর্যকে রক্ষা করতে হলে নিজের অন্তরাত্মাকে জাগরিত কর। অন্তরের ঐশ্বর্যই সবচেয়ে বড় ঐশ্বর্য।
অপূর্বশ্রী এই দেবীর বাহন পেঁচা হল কেন? এ প্রশ্ন অনেকেই করে থাকেন। দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুশক্তি। বিষ্ণু যখন আদিত্য, লক্ষ্মী তখন পদ্ম। বিষ্ণু যখন পরশুরাম অবতারে, লক্ষ্মী তখন ধরিত্রী। তাই তার বাহনও বৈচিত্র্যময়। একেবারে প্রথম শতাব্দীর কুনিন্দরাজ অমোগাভূতির মুদ্রায় মা লক্ষ্মীর পাশে হরিণ রয়েছে। উল্টো পিঠে স্বস্তিক! আবার, কুমার গুপ্তের টাকায় লক্ষ্মীর সঙ্গী ময়ূর। বঙ্গাধীপ শশাঙ্কের মুদ্রায় লক্ষ্মী ও হাঁস। এমন বহুভেদ পাওয়া যায় কোথাও সিংহ (কাশ্মীর), কোথাও কূর্ম। কিন্তু শেষমেষ পেঁচাই মা লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে স্থায়ী হয়েছে।
এর পিছনে মূলত দু’টি কারণ; পেঁচা রাতচরা পাখি। এবং কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর যে কিংবদন্তিটি রয়েছে, তার সঙ্গে রাত্রির যোগ রয়েছে। পেঁচা রাতেও দিব্যি দেখতে পায়, অর্থাৎ অন্ধকারে নিজেকে আলোকিত করে রাখে, নিজের পথ খুঁজে নেয়। যা বোধোদয় এর দ্যোতক। দ্বিতীয়ত, পেঁচা ইঁদুর, বাদুড় প্রভৃতিকে শিকার করে। ইঁদুর ফসল নষ্ট করে। বাদুড় নষ্ট করে ফল। এদের হাত থেকে ফসল বা ফলকে রক্ষা করে পেঁচা। তাই সে শস্যদেবী মা লক্ষ্মীর বাহন। এ ছাড়াও পেঁচাকে ভীষণ বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ প্রাণী বলা হয়।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।
