হৃদয় চন্দ্র,রায়পুর(লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি:
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে গিয়ে সংঘবদ্ধ জেলেদের হামলার শিকার হয়েছেন অভিযান পরিচালনাকারী দলের সদস্যরা। এ ঘটনায় উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন। এ সময় অভিযানে ব্যবহৃত স্পিডবোট লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেন হামলাকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় এবং হামলাকারীদের বাধার মুখে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের ওপর এমন হামলার ঘটনায় নদীতে অভিযান পরিচালনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) মেঘনা নদীতে উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিচালিত মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে এ ঘটনা ঘটে। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে জেলেরা সংঘবদ্ধ হয়ে কয়েকটি নৌকা একত্র করেন। পরে তারা অভিযান পরিচালনাকারীদের স্পিডবোট লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করতে থাকেন। এতে অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখে পড়েন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজ হাসনাইন জানান, অভিযানের একপর্যায়ে হামলাকারীরা সংঘবদ্ধভাবে মুহূর্তের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টি নৌকা একত্র করে। এসব নৌকায় আনুমানিক ১৩০ থেকে ১৪০ জন লোক ছিল বলে তাঁর ধারণা। তাদের অনেকের হাতে অস্ত্র ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হামলাকারীদের বাধা ও ইট-পাথর নিক্ষেপের কারণে অভিযান পরিচালনাকারীরা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কোস্ট গার্ডের চারটি স্পিডবোট যুক্ত হলেও হামলাকারীদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিপুলসংখ্যক লোক একত্র হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক না করেই অভিযান পরিচালনাকারীদের সেখানকার পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
হামলার ঘটনায় আহত পাঁচজনের মধ্যে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাও রয়েছেন। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানান, হামলাকারীদের ছোড়া ইটের টুকরা তাঁর গায়ে এসে পড়ে। এতে তাঁর চশমা ভেঙে যায় এবং তিনি সামান্য আহত হন।
নদীতে সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এভাবে হামলার শিকার হওয়ায় অভিযান পরিচালনাকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন এবং অবৈধভাবে মাছ আহরণ বন্ধে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু আইন প্রয়োগে বাধা নয়, বরং সরকারি অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
তবে আহত অন্য সদস্যদের নাম-পরিচয়, তাঁদের আঘাতের ধরন এবং চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
অভিযানের সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পার্শ্ববর্তী উপজেলার কোস্ট গার্ডের চারটি স্পিডবোট যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজ হাসনাইন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত স্পিডবোট যুক্ত হওয়ার পরও হামলাকারীদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, নদীতে অভিযান পরিচালনার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না এবং সংঘবদ্ধভাবে বাধা দেওয়া হলে তা মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন কি না।
তবে হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা, হামলাকারীদের পরিচয় এবং ঘটনার পর তাঁদের শনাক্ত করতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা এবং ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে সরকার নির্ধারিত সময়ে নদীতে মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এসব বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে নদীতে অভিযান পরিচালনা করে।
মেঘনা নদী লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসহ আশপাশের এলাকার বহু জেলের জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। তবে নিষেধাজ্ঞার সময় আইন অমান্য করে মাছ আহরণ করলে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাছের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি কিংবা দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সংগ্রহ এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা জরুরি।
রায়পুরের মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে সংঘবদ্ধ হামলার এ ঘটনা নদীতে অভিযান পরিচালনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে অভিযান পরিচালনাকারী দলের নিরাপত্তা জোরদার, প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে হামলার অভিযোগ তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং পরবর্তী পদক্ষেপ জানা গেলে ঘটনার অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
মেঘনা নদীতে মা ইলিশ রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং ভবিষ্যতে নিরাপদে অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
The post মেঘনায় মা ইলিশ রক্ষা অভিযানে হামলা, মৎস্য কর্মকর্তাসহ আহত ৫ appeared first on সকালের খবর ২৪.
