তুরস্ক, কাতার, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদার করতে ‘বদর’ নামে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর আওতায় চার দেশ যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করবে। তবে কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দেশগুলো তাকে সামরিকভাবে রক্ষা করবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা এ চুক্তিতে রাখা হয়নি।
কাতারের রাজধানী দোহায় স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ এশিয়া হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা শিল্প নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প সংস্থার প্রধান হালুক গোরগুনের ভাষ্য অনুযায়ী, যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটি একটি কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করবে।
বদর চুক্তি কী?
তুরস্ক ও কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ‘বদর’ সমঝোতা স্মারকে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে সহযোগিতার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চার দেশের বিদ্যমান শিল্প সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এই উদ্যোগের ভিত্তি হিসেবে দেশগুলোর মধ্যে আগে থেকে চলমান বিভিন্ন প্রতিরক্ষা কর্মসূচি কাজ করবে।
২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত আন্তসরকারি চুক্তির আওতায় তুরস্কের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তুর্কি অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ ইন্দোনেশিয়ার জন্য ৪৮টি ‘কান’ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নির্মাণ করছে। এসব যুদ্ধবিমানের চূড়ান্ত সংযোজন ইন্দোনেশিয়ায় সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, তুরস্কের সহায়তায় পাকিস্তান চারটি করভেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করছে। এর মধ্যে দুটি তুরস্কের ইস্তাম্বুলে এবং বাকি দুটি পাকিস্তানের করাচি জাহাজ নির্মাণ কারখানায় তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া যৌথভাবে একটি মাঝারি শ্রেণির ট্যাংক উন্নয়নের কাজ করছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে তুরস্ক ও কাতার দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতাবিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। তুরস্ক কাতারে একটি সামরিক ঘাঁটিও পরিচালনা করে।
অস্ত্র কেনাবেচা, নাকি নতুন উদ্যোগ?
হালুক গোরগুনের মতে, ‘বদর’ উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু তৈরি সামরিক সরঞ্জাম কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অংশীদার দেশগুলোর নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
এই সমঝোতা স্মারকে পারস্পরিক প্রতিরক্ষার কোনো অঙ্গীকার নেই। এ দিক থেকে এটি তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি’ থেকে আলাদা। ওই চুক্তিতে কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে সব অংশীদার দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বদর চুক্তি প্রতিরক্ষা শিল্পের নেটওয়ার্ক?
মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলো যখন নিজেদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই ‘বদর’ সমঝোতা স্মারকটি স্বাক্ষরিত হলো। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল থাকার ঝুঁকিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘বদর’ কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা শিল্প কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ।
প্রতিরক্ষা শিল্প বিশ্লেষক এবং ‘মারজেন অ্যানালিটিক্যাল স্ট্র্যাটেজিস’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরদা মেভলুতোগলু আল জাজিরাকে বলেন, এই উদ্যোগের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি আন্তসংযুক্ত প্রতিরক্ষা শিল্প নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে। এটি প্রচলিত সামরিক জোটের কাঠামোর চেয়ে ভিন্ন হবে।
আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষক আলবার্ট ভিদালের মতে, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া তুরস্কের তৈরি প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনতে আগ্রহী। একই সঙ্গে এসব সরঞ্জামের কিছু অংশ নিজ নিজ দেশে উৎপাদনের সক্ষমতাও গড়ে তুলতে চায় তারা।
এতে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ব্যয় কমতে পারে। পাশাপাশি অংশীদার দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থানীয় শিল্পের বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে অর্থায়নের মাধ্যমে কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়। কাতারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, তুরস্ক উত্তর আটলান্টিক চুক্তি সংস্থার (ন্যাটো) সদস্য হিসেবেই জোটের ভেতরে থেকে নিজেদের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অর্থাৎ, ‘বদর’ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য সরাসরি নতুন সামরিক জোট গঠন নয়; বরং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং সরবরাহব্যবস্থায় অংশীদার দেশগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানো।
