তাঁর প্রাথমিক পর্বের ছবিতে মিশে থাকত অন্ধকার। সেই অন্ধকার প্রায়শই রহস্যময় এবং একই সঙ্গে বিষণ্ণ। এই অন্ধকার কি উঠে এসেছিল দেশভাগ, খাদ্য আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক সময়মাত্রায় ঘটে যাওয়া বিষয়গুলি থেকে, না কি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল মনোগহীনের— এই প্রশ্ন কলারসিকদের ভাবাবে নিরন্তর। রহস্যময়তার এক দীর্ঘ রঙের পোঁচ ক্যানভাসে রেখেই চলে গেলেন চিত্রকর যোগেন চৌধুরী।
যোগেন চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের এক জমিদার পরিবারে। বাবা প্রমথনাথ ছিলেন শিল্পী। তাঁর মা-ও ছিলেন দক্ষ আলপনাশিল্পী। ফলে শৈল্পিক উত্তরাধিকার বংশগত ভাবেই বর্তেছিল তাঁর উপর। প্রমথনাথ হিন্দু পুরাণে উল্লিখিত ঘটনাবলি এবং পৌরাণিক চরিত্রের ছবি আঁকায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। গ্রামীণ যাত্রাপালায় অভিনীত বিভিন্ন দৃশ্যকে পটবন্দি করতেন প্রমথনাথ। বালক যোগেনের উপর অবশ্যই সেগুলি গভীর প্রভাব ফেলেছিল। দেশভাগের পর প্রমথনাথ সপরিবার কলকাতায় চলে আসেন। এসে ওঠেন এক আত্মীয়ের বাড়িতে। এই বাড়িরই একটি দেওয়ালে বালক যোগেন তাঁর প্রথম ছবিটি আঁকেন। ১৯৫৫ সালে যোগেন ভর্তি হন গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ক্রাফ্ট-এ। ১৯৬০-এ সেখান থেকে স্নাতক হন। কর্মজীবন শুরু হয় হাওড়া জেলা স্কুলে কলাশিক্ষক হিসেবে। ১৯৬২ সালে তিনি হ্যান্ডলুম বোর্ড-এ ডিজ়াইনার হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৬৫ সালে তিনি প্যারিসের একোল ন্যাশিয়োনাল দে বোজ় আর্তস-এ শিল্পশিক্ষার জন্য যান এবং কয়েক মাস লন্ডনেও কাটান। ১৯৬৮ সালের গোড়ার দিকে যোগেন কলকাতায় ফিরে আসেন এবং চেন্নাইয়ে হ্যাণ্ডলুম বোর্ডের চাকরিতে আবার যোগ দেন। সমসময়ে তিনি ক্যালকাটা পেন্টার্স গ্রুপেও যোগ দেন। ১৯৭২-এ হ্যান্ডলুম বোর্ডের চাকরি ছাড়েন এবং দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারিতে কিউরেটর পদে নিযুক্ত হন। ১৯৮৭-তে যোগেন শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যাপনার কাজে যোগ দেন।
‘জালিকাময়তা’ ছিল তাঁর অঙ্কনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ছবি: যোগেন চৌধুরীর অফিসিয়াল পেজ থেকে নেওয়া।
এই কালপর্বে যোগেনের বেশ কিছু চিত্রপ্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছে। চিত্রকর হিসেবে খ্যাতিও পেয়েছেন। পশ্চিমের শিক্ষা এবং বাংলা তথা ভারতের লোকশিল্প সম্পর্কে সংবেদ তাঁর ছবিকে প্রথম থেকেই স্বতন্ত্র চরিত্র প্রদান করেছিল। সর্বোপরি লক্ষণীয় ছিল তাঁর ড্রয়িংয়ের হাত। বিশেষত, মানবশরীরকে বিভিন্ন বিমূর্তিতে নিয়ে যাওয়ার এক জটিল কৌশলকে তিনি তাঁর প্রাথমিক পর্বের পেন্টিংয়েই আয়ত্ত করেন, যা পরবর্তী কালেও তাঁর কাজে অব্যাহত থেকেছে।
যোগেন চৌধুরীর উল্লেখযোগ্য কাজগুলির মধ্যে একদিকে রয়েছে তাঁর আঁকা প্রতিকৃতি এবং অন্যদিকে রয়েছে স্থিরচিত্র বা স্টিল লাইফ। প্যারিসের দিনগুলি সম্পর্কে তিনি জানিয়েছিলেন যে, সেখানে বিভিন্ন মডেলের স্কেচ করতে গিয়ে টের পান, তথাকথিত বাস্তবতাকে ক্যানভাসে তুলে আনার চাইতে সেই সব ‘ফিগারাইন’-এ ‘বাহুল্য’ যোগ করার একটা তাগিদ তাঁর অন্তরে রয়েছে। এই ‘বাহুল্য’ই পরে তাঁর স্বাক্ষর হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮০-র ছবি ‘চাদর গায়ে মানুষ’ বা ১৯৯৪-এর ‘সিচুয়েশন’-এর মতো ছবিতে তিনি ছবির চরিত্রদের দেহাবয়বকে এঁকেছেন শিথিল বহিঃরেখায়। এই শৈথিল্য যোগেনের প্রায় প্রতিটি কাজেই স্পষ্ট। এবং এই সব ছবির অধিকাংশেই প্রেক্ষাপট রয়েছে অন্ধকার। কখনও তা মিশমিশে কালো, কখনও তার মধ্যে মিশেছে গাঢ় নীলের ছিটেফোঁটা। আরও একটি বিষয় তাঁর সারাজীবনের কাজের মধ্যে লক্ষ করা যায়, সেটি হল— তাঁর ক্যানভাসে উপস্থাপিত চরিত্রগুলি প্রায়শই মধ্যবয়স্ক। যোগেনের সিগনেচার রেখাঙ্কন এবং ছবির পাত্র-পাত্রী নির্বাচন এমন এক জগৎকে দর্শকের সামনে নিয়ে আসে, যা চেনা বাস্তবের ধার ঘেঁষে চলে গেলেও তার নিজস্ব এক বাস্তবতা রয়েছে। প্রথাগত ভাবে যাকে ‘সুন্দর’ বলে চিহ্নিত করা যায়, যোগেনের পটে ধৃত মানবাবয়বগুলি তা কখনওই নয়। ‘উওম্যান উইথ সিলভার নেকলেস’ (২০১৪) বা ‘ইয়ং লেডি উইথ আ মিরর’-এর মতো প্রতিকৃতিগুলিতে উপস্থিত মানবীদের শরীরসংস্থান যথাযথ নয়। কখনও ঈষৎ সরে থাকা ঠোঁট, কখনও অতিরিক্ত লম্বা নাক তাঁর নিজস্ব শৈলী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শৈলীকেই আজীবন বহন করেছেন তিনি। এমনকি গ্রন্থচিত্রণেও সেই ধারা বহমান থেকেছে। দেশের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে লেখা কমল চক্রবর্তীর ‘ব্রহ্মভার্গব পুরাণ’ উপন্যাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর আঁকা এমন সব ছবি, যা কখনও দর্শককে অস্বস্তিতে ফেলে, কখনও বা এমন এক ছাপ রেখে যায় অবচেতনে, যা বছরের পর বছর স্মৃতিধৃত থেকে যায়।
মানুষ ও মানুষীর প্রতিকৃতিতে থাকত জাগতিক অনুভূতি ও সঙ্গীতের জটিলতা। ছবি: যোগেন চৌধুরীর অফিসিয়াল পেজ থেকে নেওয়া।
হিন্দু দেবতাদের চিত্রণেও এই ‘বাহুল্য’কে বজায় রেখেছিলেন যোগেন। ২০০৫ সালে আঁকা ‘গণেশ’ ছবিতে কালো প্রেক্ষাপটের উপরে গণেশের জালিকাময় দেহ এবং গোটা শরীরের বিসর্পিল আকৃতি তাঁর আঁকা মানুষদের চাইতে ভিন্ন নয়। চিত্র-আলোচক আর শিবকুমার যোগেনের আঁকা প্রতিকৃতির অন্দরের এই বিসর্পিলতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন নাগরিক জীবনের জটিলতার ছাপ, খুঁজে পেয়েছেন একরকমের সাঙ্গীতিকতাকেও। সঙ্গীত, বিশেষত ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতি তাঁর বিপুল আগ্রহ ছিল। তাঁর ছেড়ে আসা গ্রাম ফরিদপুরের কোটালিপাড়ার শিল্পী পণ্ডিত তারাপদ চক্রবর্তী প্রবর্তিত কোটালি ঘরানার শিল্পী রুচিরা পাণ্ডা আনন্দবাজার ডট কম-কে জানালেন সেই আগ্রহের কথা। রুচিরা তাঁর স্মৃতিচারণে জানালেন, তাঁর ছবিতে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা ‘বাহুল্য’ বা আকৃতির স্বাভাবিকতাকে আঘাত করার প্রবণতা নিয়ে কথাপ্রসঙ্গে তাঁকে এক বার শিল্পী জিজ্ঞেস করেছিলেন, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই প্রবণতা রয়েছে কি না। উত্তরে রুচিরা জানিয়েছিলেন, দুই বা চার লাইনের বন্দিশকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত যে ভাবে এক ঘণ্টার খেয়ালে পরিণতি দেয়, তা একপ্রকার প্রলম্বন তো বটেই। সেই উত্তর যোগেনকে আনন্দ দিয়েছিল। তিনি স্মরণে এনেছিলেন মথুরা আর্টে বুদ্ধের প্রলম্বিত কানের প্রসঙ্গ। এদিক থেকে দেখলে, যোগেনের কলায় খুঁজে পাওয়া যেতে পারে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্যকেও। হয়তো তাঁর বিসর্পিল রেখায় জড়িয়ে রয়েছে অজস্র রাগের তানকারি, গমক।
যোগেনের ছবির জগতের একটি অংশ যদি প্রতিকৃতি হয়ে থাকে, অন্য অংশে তবে রয়েছে তাঁর আঁকা স্থিরচিত্র বা স্টিল লাইফগুলি। এই ছবিগুলির ক্ষেত্রে যোগেন বেছে নিয়েছিলেন বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনে নিত্যব্যবহার্য সামগ্রীগুলিকে। নিত্যপরিচিত এই জগৎ কলা-আলোচক মনসিজ মজুমদারের মতে ‘নিত্য-উপেক্ষিত’-ও বটে। এই ছবিগুলির একদিকে যেমন রয়েছে তাঁর পশ্চিমি শিক্ষা, অন্যদিকে তেমনই থেকে গিয়েছে শিকড়ের টান। কাপ, গেলাস, বাটি, ফুলদানি, বালিশ, তোষক ইত্যাদি অঙ্কনে যোগেন পশ্চিমি আধুনিক চিত্রভাষার অন্ধ অনুকরণ না করে নিজস্ব চিত্রভাষা নির্মাণ করেন। বিশেষ করে যোগেনের অগণিত ছবিতে ছড়িয়ে রয়েছে ফুল। এই ফুল তার বাস্তবাকার থেকে বেরিয়ে যেন এক অ-সুখের স্বপ্নের দিকে প্রসারিত। এখানেও তাঁর রেখাঙ্কন গতিময়। কখনও সেই গতি তাঁর আঁকা প্রতিকৃতির মতো শিথিলও। আর এক কলা-আলোচক অনুরাধা ঘোষ তাঁর ‘দি আফটারলাইফ অফ সাইলেন্স: স্টিল লাইফস অফ যোগেন চৌধুরী’ গ্রন্থে যোগেনের আঁকা অবয়বগুলির ভিতরে বিশেষ একপ্রকার ‘জালিকাজ’-এর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যা তাঁর আঁকা ‘গণেশ’-এও পরিব্যাপ্ত। মনসিজ মজুমদার এই জালিকাময়তার মধ্যেই দেখতে পেয়েছেন কৌতুক, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, এমনকি জীবন ও মৃত্যুর পারস্পরিক সংযোগকেও। কখনও কখনও এই সব স্থিরচিত্রের ছায়া প্রলম্বিত হয়েছে তাঁর আঁকা প্রতিকৃতিগুলিতেও, সেখানেও চরিত্রেরা প্রায়শই ‘জীবন্মৃত’ অবয়বে দৃশ্যমান।
তাঁর ছবিতে ছড়িয়ে ছিল অবয়বের স্বাভাবিকতাকে ছাড়িয়ে বহুদূরের আভাস। ছবি: যোগেন চৌধুরীর অফিসিয়াল পেজ থেকে নেওয়া।
সমকালের নিরিখে যোগেন চৌধুরী অবশ্যই একজন ‘আধুনিক’ চিত্রকর। তাঁর ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল ‘ম্রিয়মাণতা’। এই মর্তুকামনা অবশ্যই নাগরিক যাপন থেকে জাত। কিন্তু তাতে যে হাজার হাজার বছরের দেশজ বা লোকশিল্পের শিকড় চারিয়ে নেই, সে কথাও বলা যায় না। নিষ্প্রাণ বস্তুকে তাঁর বিসর্পিল রেখাঙ্কন যেমন প্রাণময় করে তুলেছে, তেমনই সেই বস্তুগুলির শরীরে আঁকা জালিকাময় রেখা যেন লোলচর্ম সমাজবাস্তবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। মনসিজবাবু যোগেনের সামগ্রিক ছবিতে সপ্রাণকে নিষ্প্রাণ আর নিষ্প্রাণকে সপ্রাণ করার এক ক্রিয়াকে সতত লক্ষ করে গিয়েছেন। এই দোলাচল যেন তথাকথিত আধুনিকতার গণ্ডিকে টপকে আরও বহুদূরে প্রসারিত। ইউরোপীয় ইম্প্রেশনিজ়মের প্রভাব তাঁর উপরে থাকলেও তিনি তাকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন বলেই মনে করেন আলোচকেরা। তাঁর আঁকা ‘আপেল’ কখনওই ফরাসি ইম্প্রেশনিস্ট পল সেজ়ানের বিখ্যাত ‘আপেল’-এর অনুকৃতি নয়। যোগেনের ‘আপেল’ বিমর্ষ হলুদে রঞ্জিত। এই হলুদ যেন ভারতীয় লোকশিল্পীদের ব্যবহৃত এলামাটির হলুদ, যা পড়ন্ত বিকেলের মত বিষণ্ণ, ম্রিয়মাণ জীবনের অস্তরাগের স্পর্শ তার গায়ে। তাঁর ‘স্বপ্ন’ এবং ‘স্বপ্নের স্মৃতি’ সিরিজ়ের ছবিগুলি পরাবাস্তবের খুব ধার ঘেঁষে চলে যায়, যেখানে জীবন ও মৃত্যু একে অপরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
শেষজীবনে কালি-কলমের কাজেই বেশি মন দিয়েছিলেন যোগেন। মোটা ব্রাশের কাজেও কিন্তু চেনা সর্পিলতা অনাবিল ছিল। ক্যানভাস বা কাগজ, যে পটেই তিনি ছবি আঁকুন না কেন, নীচে স্বাক্ষর করতেন ‘যো’। এই অসম্পূর্ণ স্বাক্ষরটিকে তাঁর প্রয়াণের পর বড় বেশি বাঙ্ময় বলে মনে হতে পারে। মনে হতেই পারে, অনাগত কালের দিকে নিজের তুলি ধরা হাতটিকে বাড়িয়ে দিয়েছেন, যেখানে জীবন ও মৃত্যুর শাশ্বত সত্যটি জালিকাজটিল। যে জটিলতা আসলে জীবনের, কিন্তু তাকে লোল করে রাখে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সমাজসত্যের দোলাচল আর যাপনের যন্ত্রণা। যোগেন চৌধুরীর ছবির প্রেক্ষাপটের অন্ধকার এই মুহূর্তের সমাজসত্যকেও যেন ছুঁয়ে রয়েছে। গাঢ় নীল বা নিকষ অমার প্রেক্ষিতে তাঁর আঁকা মানুষ-মানুষী, দৈনন্দিনের সামগ্রী থেকে শুরু করে নেতিয়ে পড়া পাপাড়ি-সহ ফুল যেন এক দীর্ঘ দুঃসময়েরই দ্যোতক, যার সূত্রপাত তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন দেশভাগে, খাদ্য আন্দোলনে, সমাজবাদের প্রতি মোহভঙ্গের মধ্যে। যে দুঃসময় এখনও ছেয়ে রয়েছে বাঙালির অন্তর ও বাহির।
