গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আগে অধিগ্রহণ করা জমি পুনরায় অধিগ্রহণ দেখিয়ে মুনছুর আলী নামে এক ব্যক্তিকে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩২ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট নথি সূত্রে জানা যায়, পলাশবাড়ী উপজেলার নুনিয়াগাড়ী মৌজার রাব্বীর মোড় এলাকায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৮৩১ দাগের সাড়ে ১০ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর বিপরীতে ক্ষতিপূরণের অর্থ পান মুনছুর আলী। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, ওই দাগের জমির একটি অংশ ১৯৫৭-৫৮ সালেই অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। ফলে মুনছুর আলীর নামে পুনরায় ক্ষতিপূরণ দেয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের অভিযোগ, তার মা রেখা বেগমসহ কয়েকজন ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল ২৪৫৩ নম্বর দলিলে আট শতক জমি কেনেন। ওই জমির একটি অংশ মহাসড়কের জন্য অধিগ্রহণের সীমানার মধ্যে পড়লেও তারা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি। পরে আপত্তি জানালে তাকে মাত্র দশমিক ৪০ শতক জমির ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ হয়। তার দাবি, প্রাপ্য জমির তুলনায় তাকে কম ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে।
রেজাউল করিমের দাবি, জমির নথি অনুযায়ী মুনছুর আলীর বাবা মোফাজ্জল হোসেনের মালিকানাধীন জমির একটি অংশ আগেই অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। ১৯৫৭-৫৮ সালে ১/৬৯/১৯৫৭/৫৮ নম্বর এলএ মামলায় ৩২ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ৮৩১ দাগ থেকে ২০ শতক এবং ৮৪২ দাগ থেকে ১২ শতক জমি নেয়া হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, অধিগ্রহণের পর মোফাজ্জল হোসেনের নামে ১৯৬২ সালের জরিপে ওই জমিসহ পুনরায় রেকর্ড হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি স্ত্রী ও মেয়েদের ৫২ শতক জমি দান করেন এবং দুই ছেলে মোকছেদ ও মুনছুর আলীকে ৭০ শতক জমি দলিল করে দেন।
রেজাউল করিমের হিসাব অনুযায়ী, ৩২ শতক অধিগ্রহণ এবং ৫২ শতক দানের পর মোফাজ্জলের অবশিষ্ট থাকার কথা ৪৩ শতক। সে হিসাবে দুই ছেলের প্রত্যেকের প্রাপ্য ২১ দশমিক ৫০ শতক। মুনছুর আলী তার প্রাপ্য জমির মধ্যে ১৬ শতক বিক্রি করেছেন এবং প্রায় ছয় শতক জমিতে বাড়ি করে বসবাস করছেন। ফলে তার নামে নতুন করে সাড়ে ১০ শতক জমির ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রেজাউল করিম।
এদিকে, ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়ে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল গাইবান্ধার জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন সাসেক সড়ক সংযোগ-২ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফিরোজ আখতার।
চিঠিতে বলা হয়, নুনিয়াগাড়ী মৌজার আরএস ২৫ খতিয়ানের ৭৯ ও ৮০ দাগের মোট ১ একর ২৭ শতক জমির মধ্যে ১৯৫৭-৫৮ সালের এলএ মামলায় ৩২ শতক অধিগ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। পরবর্তী সময়ে বিআরএস জরিপে ৭৯ দাগটি ৮৩১ এবং ৮০ দাগটি ৮৪২ দাগে রূপান্তরিত হয়। তবে আগের অধিগ্রহণ করা জমি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নামে বিআরএস রেকর্ডভুক্ত হয়নি। এ কারণে ৮৩১ দাগের ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ স্থগিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এরপরও মুনছুর আলীকে ৫ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩২ টাকা পরিশোধ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় রাজস্ব শাখার তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আল মামুনসহ সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, বিষয়টি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে খোঁজখবর নিয়েছেন। তার ভাষ্য, ১৯৫৭-৫৮ সালে জমি অধিগ্রহণের পর গেজেটের মাধ্যমে তা প্রত্যাশী সংস্থার নামে রেকর্ড হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা না হওয়ায় ভুলক্রমে অন্যদের নামে জমি রেকর্ড হয়েছে এবং পরে তারাই ক্ষতিপূরণের অর্থ তুলেছেন। বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত এবং এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে মুনছুর আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি। মুঠোফোনে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তার দাবি, জমিটি বাবার কাছ থেকে পাওয়া এবং সরকারের কাছে তিনি আরও জমি পাবেন। তার বিরুদ্ধে একটি কুচক্রী মহল মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, প্রত্যাশী সংস্থার আপত্তির বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া উচিত ছিল। তিনি সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে প্রকৃত ঘটনা জানার কথা জানান। তার ভাষ্য, কেউ ভুল তথ্য দিয়ে ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ তুলে নিলে তা ফেরত নেয়ার জন্য আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাট পর্যন্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার এলাকায় জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
