একই পরিবারে চারজন মানসিক রোগীর মানবেতর জীবন
এনায়েতুর রহমানপ্রকাশ:
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বগা ইউনিয়নের বামনিকাঠি গ্রামের একটি পরিবারে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। একই পরিবারের চারজন দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে পরিবারের ছোট ছেলে সবুজও নানা শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত। অভাবের কারণে হচ্ছে না প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। অসুস্থতা আর দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে মানবেতর জীবন কাটছে পরিবারটির সদস্যদের।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, পরিবারের কর্তা ইউসুফ হাওলাদার (৭০), তার স্ত্রী সহার ভানু (৬০), বড় ছেলে নুরুল ইসলাম (৩৭) ও বড় মেয়ে রাসেদা (৩২) দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যায় ভুগছেন। ছোট ছেলে সবুজের বয়স মাত্র ১৮ বছর। তিনিও শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। পরিবারের মেজো ছেলে সব্দার (২৬) ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তার সীমিত আয়ে কোনো রকমে চলে সংসার। আরেক মেয়ে লাবলি (২৮) বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে থাকেন।
পরিবারটির দুর্দশার কথা বলতে গিয়ে সবুজ বলেন, ‘আমরা সবাই কমবেশি অসুস্থ। বড় বোন সারাদিন পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। বাধা দিলে গালিগালাজ করে, তাই আর বাধা দিই না। বড় ভাই সারাদিন পানি টেনে এনে গোবর, মাটি ও ময়লা মিশিয়ে চারদিকে ছিটাতে থাকে। আমিও অসুস্থ। কিছুদিন আগে পটুয়াখালী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে এসেছি। এখনো শরীরটা খারাপ লাগছে।’
একই পরিবারের চারজনের মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে প্রতিবেশীদেরও। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার অভাবে দিন দিন বাড়ছে পরিবারটির দুর্ভোগ।
প্রতিবেশী মমিন হাওলাদার বলেন, আগে তাদের অনেকেই স্বাভাবিক ছিলেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একে একে চারজনের এমন অবস্থা হয়েছে। উন্নত চিকিৎসা পেলে হয়তো তারা অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠতে পারতেন।
আরেক প্রতিবেশী আবুবকর মিল্টন বলেন, ইউসুফ হাওলাদার বিয়ের আগে থেকেই কিছুটা ব্যতিক্রমী স্বভাবের ছিলেন। অন্যরা যখন ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ করতেন, তখন তিনি একাই কোদাল দিয়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ জমি চাষ করতেন। একা একা কথা বলতেন। এখনো তিনি নিজের মতো চলাফেরা করেন। প্রতিবেশীরা সাধ্যমতো চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও এখন আর তাদের পক্ষে সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার উদ্যোগ নিলে পরিবারটি উপকৃত হবে।
স্থানীয়রা জানান, পরিবারের একাধিক সদস্য অসুস্থ থাকায় তাদের নিয়মিত দেখাশোনা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বড় মেয়ে রাসেদার নিরাপত্তা এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পরিচর্যা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তাদের। দ্রুত পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
জানা গেছে, বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ পরিবারটির খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
পরিবারটির একমাত্র নিয়মিত উপার্জনক্ষম সদস্যের সীমিত আয়ে সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে সবার চিকিৎসার ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে চিকিৎসার অভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটছে তাদের দিন। পরিবারটির সদস্যদের সুস্থ জীবন ফিরিয়ে দিতে সরকারি উদ্যোগ, উন্নত চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন।
অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকার, সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিবারটির সদস্যরা চিকিৎসা ও পরিচর্যার সুযোগ পাবেন, কমবে তাদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
