কালবেলা · স্বাস্থ্য
অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটানো কি নিরাপদ? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
২২/১০/২০২৬

আমাদের সমাজে কেউ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়লে তার মুখে ঠান্ডা পানি ছিটানো বা মাথায় পানি ঢালা এক চিরচেনা প্রথা। পারিবারিক পরিবেশ কিংবা নাটকের দৃশ্য; সবখানেই প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে এই পদ্ধতির বহুল ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফার্স্ট এইড বা জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান কি এই অভ্যাসকে আদৌ সমর্থন করে?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত স্বাস্থ্যবিষয়ক এক বিশেষ প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, সংজ্ঞাহীন ব্যক্তির মুখে পানি ছিটানো কেবল একটি ভুল ধারণা বা কুসংস্কারই নয়, বরং এটি রোগীর জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় ভারতের খ্যাতনামা অস্থিরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মীর জাওয়াদ জার খান জানান, কেউ জ্ঞান হারালে তার মুখে পানি ছিটানো চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক একটি কাজ।
এছাড়া থানের কিমস হাসপাতালের ইমার্জেন্সি মেডিসিন বিভাগের প্রধান ড. অলোক গাঙ্গুরদে ব্যাখ্যা করেছেন যে, পানি ছিটানোর মতো বাহ্যিক চেষ্টা মূল শারীরিক সমস্যার কোনো চিকিৎসা করে না, বরং জরুরি মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করিয়ে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
পানি ছিটানো কেন বিপজ্জনক? চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
একজন মানুষ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে হঠাৎ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়তে পারেন—যার মধ্যে রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাসের ঘটনা, হৃদস্পন্দনের অসঙ্গতি, সিজার কিংবা স্ট্রোক অন্যতম।
ড. অলোক গাঙ্গুরদের মতে, মুখের ওপর পানি ছিটিয়ে এর কোনো একটির মূল কারণ নিরাময় করা সম্ভব নয়। তদুপরি, এই কাজের ফলে দুটি প্রধান বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে:
শ্বাসরোধ বা ফুসফুসে পানি প্রবেশের ঝুঁকি: একজন সংজ্ঞাহীন মানুষ তার শ্বাসনালীকে নিজে থেকে সুরক্ষিত রাখার শারীরিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফলে সেই অবস্থায় মুখে বা নাকে পানি ছিটালে তা শ্বাসনালীতে আটকে শ্বাসরোধ ঘটাতে পারে কিংবা সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে মারাত্মক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
আসল জরুরি অবস্থা চেনার পথে বাধা: পানি ছিটিয়ে জ্ঞান ফেরানোর দীর্ঘ ব্যর্থ চেষ্টা আশেপাশের মানুষকে আসল বিপদের মাত্রা অনুধাবন করা থেকে বিচ্যুত করে। বিশেষ করে রোগী যদি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন, তবে তিনি হাঁসফাঁস করতে পারেন বা নাক ডাকার মতো অস্বাভাবিক শব্দ করতে পারেন। সাধারণ মানুষ পানি ছিটানোয় ব্যস্ত থাকলে এই সতর্কবার্তাগুলোকে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস মনে করে ভুল করতে পারেন।
জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক প্রাথমিক চিকিৎসা (ফার্স্ট এইড)
কারো জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মুহূর্তে পানি ছিটানোর পেছনে সময় নষ্ট না করে রোগীর পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত:
রোগী যদি ঝিমুনি অনুভব করেন কিন্তু সজ্ঞান থাকেন: তাকে দ্রুত সমতল স্থানে শুইয়ে দিন এবং কোনো আঘাতের ঝুঁকি না থাকলে পা দুটি কিছুটা ওপরের দিকে তুলে ধরুন। প্রাথমিক লক্ষণ টের পেলে পা ক্রস করা, উরুর পেশিতে চাপ দেওয়া বা হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করার মাধ্যমে রক্তচাপ বজায় রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।
রোগী যদি অচৈতন্য হন এবং স্বাভাবিক শ্বাস না নেন: ১০ সেকেন্ডের বেশি সময় নষ্ট না করে সাড়াশব্দ ও শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করুন। সাড়াশব্দ না থাকলে ও স্বাভাবিক শ্বাস না চললে অবিলম্বে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নম্বরে (যেমন: ১১২) কল করুন। চিকিৎসকের বা স্পিকারের নির্দেশনা মেনে অনতিবিলম্বে সিপিআর শুরু করুন এবং সুযোগ থাকলে অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর ব্যবহার করুন।
রোগী অচৈতন্য কিন্তু স্বাভাবিক শ্বাস চললে: মেরুদণ্ডে আঘাতের ভয় না থাকলে তাকে একপাশে কাত করে ‘রিকভারি পজিশনে’ শুইয়ে রাখুন এবং অ্যাম্বুলেন্স না আসা পর্যন্ত তাঁর শ্বাসের ওপর নজর রাখুন।
জরুরি মুহূর্তে যেসব ভুল একদমই করা যাবে না
জরুরি স্বাস্থ্যসেবা দলের জন্য অপেক্ষাকালে রোগীকে কখনোই একা রেখে যাওয়া যাবে না। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রোগীর গায়ে চড় মারা, জোরে ঝাঁকানো কিংবা মুখে পানি ছিটানো সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
এছাড়া, অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে জোর করে পানি, খাবার বা কোনো ধরনের ওষুধ দেওয়া যাবে না। ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে শর্করা কমে গেছে সন্দেহ হলেও অচৈতন্য অবস্থায় মুখে চিনি দেওয়া যাবে না; কারণ গিলে খাওয়ার ক্ষমতা না থাকায় এতে শ্বাসনালী পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। রোগী সম্পূর্ণ জ্ঞান ফিরে পেলে এবং নিরাপদে গিলে খেতে সক্ষম হলেই কেবল তাঁকে মুখে খাবার বা মিষ্টি দেওয়া নিরাপদ।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗