ফ্রান্সের প্রধান শহরগুলোতে গতকাল শনিবার ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠনের সদস্য, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্কুলের অবকাঠামো সংস্কার, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা, আবাসন ব্যয় কমানো এবং জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় সরকারি পদক্ষেপের দাবিতে টানা চতুর্থ সপ্তাহের মতো এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। গত সপ্তাহের বিক্ষোভ ঘিরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে সরকার। মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৭০ হাজার সদস্য। একই দিনে স্পেন,
ইতালি, আলবেনিয়া, পর্তুগাল, অস্ট্রিয়া ও আয়ারল্যান্ডেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ মার্সেই, লিয়ঁ, তুলুজ, লিল ও অর্লেয়াঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নামেন। কোথাও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মিছিল হয়েছে, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। তবে দিনের বেশির ভাগ সময় বিক্ষোভগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। গত শনিবার এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ হাজার। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শনিবার সারাদেশে ১৩৬টি প্রকাশ্য বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগের সপ্তাহান্তে এ সংখ্যা ছিল ২৬৪টি। দিনের পরবর্তী সময়ে তিনি জানান, বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় পুলিশ ১৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ও বিপজ্জনক সামগ্রীও জব্দ করা হয়েছে।
প্যারিসে শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে হাজারো মানুষ মিছিলে অংশ নেন। সিজিটি, সিএফডিটি, এফএসইউ ও সলিডেয়ার্সসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর প্রতি সংহতি জানিয়ে এ কর্মসূচির আয়োজন করে। মিছিলে তরুণ-তরুণীদের পাশাপাশি পরিবার, চাকরিজীবী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও অংশ নেন।
নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে রাজধানীর ২৪টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ চত্বর, সরকারি ভবন ও পরিবহনকেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শহরের বিভিন্ন দোকানপাট, বিশেষ করে গত সপ্তাহে ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অনেক দোকানের জানালা ও সামনের অংশ কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়ে হাজারো মানুষ প্রধান সড়ক লা কানেবিয়ের ধরে মিছিল করেন। শহরটিতে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জের পর আদালত তা বাতিল করেন। তবে মিছিল চলাকালে পুলিশের সঙ্গে একপর্যায়ে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারীর উত্তেজনা দেখা দেয়।
লিয়ঁ শহরে জ্যঁ-মাসে চত্বর থেকে বিক্ষোভকারীরা মিছিল শুরু করেন। নিষিদ্ধ এলাকায় প্রায় ১৫০ জনের একটি দল সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। তবে এর পরও শহরে বিক্ষোভ অব্যাহত ছিল। একুশ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, পুলিশ দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গিয়ে মিছিল গড়ে ওঠার আগেই তা ছত্রভঙ্গ করছে।
তুলুজ ও লিল শহরেও বিক্ষোভ মিছিল হয়। অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা বোর্দো শহরে ট্রাম চলাচল বাতিল করা হলেও বিক্ষোভকারীরা দ্য লা বুর্স চত্বরে জড়ো হন।
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট মাখোঁ শুক্রবার বিকালে ২০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন। শিক্ষার্থী আন্দোলনের সংগঠন হাইস্কুল রিনিউয়ালের সভাপতি নাথানায়েল কমবারি বলেন, প্রেসিডেন্ট তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়ে সোমবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর সঙ্গে আলোচনা চলবে। তবে তিনি ও অন্য শিক্ষার্থী নেতারা সহপাঠীদের সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ফ্রান্সের বাইরে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদেও শনিবার বড় বিক্ষোভ হয়েছে। দেশটির সরকারি পেনশনব্যবস্থা সুরক্ষার দাবিতে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
স্পেনে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আগাম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের আগে পেনশনব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের অভিযোগ, রক্ষণশীল পিপলস পার্টি পেনশনব্যবস্থা বেসরকারিকরণের পক্ষে। অন্যদিকে ডানপন্থি রাজনীতিকরা বর্তমান ব্যবস্থার আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ইতালির বিভিন্ন শহরে শনিবার শিক্ষার্থী ও তরুণদের আরও বিক্ষোভের আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গত সপ্তাহান্তে দেশটিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় কয়েকটি স্থানে লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল।
মিলানে গত সপ্তাহে বড় ধরনের লুটপাটের ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শহরটিতে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েন করেছেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে শাস্তি আরও কঠোর করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। পুলিশের দাবি, মিলানের লুটপাটে প্রায় দুই হাজার তরুণ জড়িত ছিল।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় কয়েক দিনের সহিংস অস্থিরতার পর শনিবার আবারও সরকারবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গত সপ্তাহ থেকে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন।
বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। আটক হয়েছেন কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী। সরকারি ভবনেও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
আন্দোলনকর্মী সিদোরেলা ভাতনিকাজ এএফপিকে বলেন, মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। তিনি আন্দোলনকে বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য, এ আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থী বা পরিবেশ রক্ষার দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অধিকার ও আইনের শাসনের অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত।
