Published on
:
2 min read
পার্থময় চট্টোপাধ্যায়
ভোর পাঁচটায় ঘুম ভাঙল। শ্যামবাটির পুজোমণ্ডপ থেকে ভেসে আসছে চণ্ডীপাঠ। ঘরের বাইরে পা রাখতেই চোখে পড়ল শ্যামবাটির রাস্তা। পুজোয় সাজানো নিয়ন বাতিগুলো যেন ক্লান্ত চোখে আলো ছড়িয়ে চলেছে। ভোরের আলো-আঁধারি, হালকা ঠান্ডা বাতাস আর দু-একটি খোলা চায়ের দোকান। বাতাসে মিষ্টি একটা গন্ধ। আশপাশের কোথাও হয়তো কুর্চি ফুল ফুটেছে। তারই মাদকতা মিশে আছে ভোরের হাওয়ায়।
সুরুল জমিদারবাড়িতে পৌঁছনোর বেশ কিছুটা আগে থেকেই ধুনোর গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই গন্ধ যেন চারপাশে এক পবিত্র আবহ তৈরি করেছে। জমিদারবাড়িতে পৌঁছে দেখি, সকালেই বেশ কিছু দর্শনার্থী নাটমন্দিরে উপস্থিত। পরিবারের লোকজনের মধ্যেও ব্যস্ততা। একদিকে সন্ধিপুজোর আয়োজন চলছে, অন্যদিকে সন্ধিপুজোর পর যে পাঠাবলি হবে, তার জন্য হাড়িকাঠের স্থানটি গোবর দিয়ে লেপে প্রস্তুত করা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মায়ের ভোগের থালা একের পর এক আসতে শুরু করল।
বিকেলের দিকে আবার শুরু করলাম ঠাকুর দেখা। সারা শহরে চারচাকা ও তিনচাকার গাড়ি চলাচল বন্ধ। রাস্তায় শুধু দু-চাকার গাড়ির দৌরাত্ম্য। শ্যামবাটি থেকে সোনাঝুরি, গোয়ালপাড়া, তালতোড় ও প্রান্তিক—এই কয়েকটি জায়গায় গাড়ি চলাচলের অনুমতি রয়েছে।
সন্ধ্যায় চলে এলাম হীরালিনী দুর্গাপুজো মণ্ডপে। সোনাঝুরি জঙ্গলে বাঁধন দাসের পুজো বলে পরিচিত যে পুজো, অনেকে তাকে বনপুকুরডাঙা-বল্লভপুর জঙ্গলের পুজোও বলেন। আগের মতো এ পুজোয় আর তেমন জৌলুস নেই। চোখে পড়ল না আদিবাসীদের গানের আসর, বাউলদের আনাগোনাও তেমন নেই। দোকানপাটও আগের তুলনায় কম।
মন ভরে গেল গোয়ালপাড়ার দক্ষিণ দুয়ারের পুজোমণ্ডপে এসে। লোকজন তেমন নেই, অথচ দেবী দুর্গা যেন গোটা গ্রামটাকে আনন্দে ভরিয়ে রেখেছেন। এটি একটি পারিবারিক পুজো। শুনলাম, সাত পুরুষ ধরে এই পুজো চলে আসছে। প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো এই পুজোর ঐতিহ্য ও আন্তরিকতা আজও অটুট।
শ্যামবাটি দুর্গামন্দিরের পুজোও প্রতিবারের মতো এবার নতুনত্বের বার্তা দিয়েছে। মোবাইল ফোন কী ভাবে আমাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে, সেই কথাই ছবির মাধ্যমে তুলে ধরেছে মণ্ডপ।
ভালো লেগেছে প্রান্তিক রেলমাঠ ও বোলপুর রেলমাঠের দু’টি পুজোই। হাটতলার পুজোতেও রয়েছে নতুন ছোঁয়া। অনেক ঠাকুর দেখলাম। আলোর রোশনাইয়ে বোলপুর এ বছর যেন কলকাতা শিলিগুড়ি শহরকে টেক্কা দিয়েছে। আর জামবনির পুজো—সত্যিই মুগ্ধ হওয়ার মতো। আলো, প্যান্ডেল আর দুর্গাপ্রতিমা, সবেতেই রয়েছে অপূর্ব সামঞ্জস্য। পাখি ও প্রকৃতি এই পুজোর মণ্ডপ শয্যায় স্থান পেয়েছে ।
তবু এ বছরের বোলপুরের পুজোয় একটা অভাব চোখে পড়ল। পুজোর আয়োজন জমকালো হলেও মানুষের উৎসাহ যেন তেমন দেখা গেল না। বাইরে থেকে পর্যটকের আনাগোনাও অনেক কম। রাত দশটার পর রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। এর অন্যতম প্রধান কারণ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ। রাস্তা ফাঁকা, কিন্তু বিকেল চারটে থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকায় বহু মানুষ পুজো দেখতে বেরোনোর উৎসাহ হারিয়েছেন।
বোলপুরের বনেদি বাড়ির ঐতিহ্য, গ্রামের পারিবারিক পুজোর আন্তরিকতা আর আধুনিক মণ্ডপের আলোর মেলা—সব মিলিয়েই এখানকার দুর্গাপুজো স্বতন্ত্র। সেই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখেও হাসি ফিরিয়ে আনতে হবে।
FAQ
১. বোলপুরের কোন কোন দুর্গাপুজো মণ্ডপের কথা প্রতিবেদনে রয়েছে?
উত্তর: সুরুল জমিদারবাড়ি, শ্যামবাটি দুর্গামন্দির, হীরালিনী, গোয়ালপাড়ার দক্ষিণ দুয়ার, প্রান্তিক রেলমাঠ, বোলপুর রেলমাঠ ও জামবনির পুজোর কথা রয়েছে।
২. গোয়ালপাড়ার দক্ষিণ দুয়ারের পুজো কত বছরের পুরোনো?
উত্তর: এই পারিবারিক দুর্গাপুজো প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো।
৩. শ্যামবাটি দুর্গামন্দিরের মণ্ডপে কী বিষয় তুলে ধরা হয়েছে?
উত্তর: মোবাইল ফোনের কারণে কী ভাবে শিশুদের শৈশব প্রভাবিত হচ্ছে, তা ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
৪. জামবনির দুর্গাপুজোর বিশেষ আকর্ষণ কী?
উত্তর: আলো, প্যান্ডেল, দুর্গাপ্রতিমা এবং পাখি ও প্রকৃতিনির্ভর মণ্ডপসজ্জার সামঞ্জস্য।
৫. বোলপুরের দুর্গাপুজোয় দর্শনার্থীদের উৎসাহ কম হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: প্রতিবেদনে যানবাহন নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিকেল ৪টে থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকায় অনেকেই পুজো দেখতে বেরোনোর উৎসাহ হারিয়েছেন বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ।
