বয়স ৭০ পেরিয়েছে। শরীরের শক্তি কমেছে, আগের মতো হাঁটাচলাও করতে পারেন না। তবু জীবিকার তাগিদে থেমে নেই তাঁর পথচলা। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে ঘোল বিক্রি করেই জীবনের চাকা ঘুরিয়ে চলেছেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার জয়রামপুর গ্রামের মদন কুমার ঘোষ। একসময় যশোর শহরের পথে পথে ঘুরে ঘোল বিক্রি করতেন। এখন বয়সের ভারে আর দূরে যেতে পারেন না। তাই ধর্মতলা-ছুটিপুর সড়কের বাগমারা ইটভাটা নামক স্থানে একটি তেঁতুলগাছের নিচে বসেই করেন জীবন-জীবিকার লড়াই।
এভাবেই প্রতিদিন তেঁতুলগাছের ছায়ায় বসে ক্রেতার অপেক্ষায় থাকেন মদন ঘোষ। তাঁর কাছে এক গ্লাস ঘোলের দাম মাত্র ১০ টাকা। প্রতিদিন বিক্রি করেন ৪শত থেকে ৫শত টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন তিনি। জীবনের দীর্ঘ সময় পার করে এসেও সংসারের দায়িত্ব তাঁকে বসে থাকতে দেয়নি।
মদন কুমার ঘোষের ঘোল বিক্রির গল্প আজকের নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে তিন প্রজন্মের পারিবারিক ঐতিহ্যে। দাদা নবীন চন্দ্র ঘোষও ঘোল বিক্রি করতেন। পরে বাবা কাঠিরাম ঘোষের হাত ধরে এই পেশায় যুক্ত হন তিনি। বাল্যকাল থেকেই বাবার সঙ্গে ঘোল বিক্রির কাজে যুক্ত হয়ে একসময় নিজেই কাঁধে তুলে নেন পরিবারের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসার ভার।
শৈশব-কৈশোরে যশোর শহরের বিভিন্ন পথে ঘুরে ঘুরে ঘোল বিক্রি করেছেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ঘোল। সেই পথচলায় কেটে গেছে জীবনের ৫৪টি বছর। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর বয়স, বদলেছে শারীরিক সামর্থ্য; কিন্তু বদলায়নি জীবিকার সংগ্রাম।
আজ আর আগের মতো শহরের পথে পথে ঘুরতে পারেন না মদন ঘোষ। বয়সের ভারে শরীর ক্লান্ত। তাই গ্রামের তেঁতুলগাছের নিচেই তাঁর বর্তমান কর্মস্থল। গাছের ছায়ায় বসে ঘোল বিক্রির মধ্য দিয়ে দিন পার করেন তিনি। কখনো ক্রেতা আসে, কখনো অপেক্ষায় কাটে দীর্ঘ সময়—তবু জীবিকার আশায় বসে থাকেন।
ঘোল খেতে আসা মেসবাউর রহমান বলেন, আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি মদন দাদু এই তেতুলতলায় বসে ঘোল বিক্রি করছেন। তার ঘোল সুস্বাদু এবং ১০ টাকা গ্লাস হওয়ায় আমরা প্রায়ই তার কাছ থেকে ঘোল খায়। তার মতো ঘোল অত্র এলাকায় কেউ বানাতে পারে না।
ইজিবাইক চালক শামীম জানান, আমি বাগমারার এই রাস্তায় নিয়মিত ইজিবাইক চালায়। চলাচলের পথে প্রায়ই তার কাছ থেকে ঘোল খাই। এমনকি আমার গাড়ির যাত্রীরাও মাঝে মাঝে এই তেতুলতলায় বসে ঘোল খেয়ে থাকে।
চাষী ইদ্রিস আলী জানান, আমরা মাঠে চাষাবাদ করতে এসে তেতুলতলায় বসে ঘোল খেয়ে থাকি। অনেক দুর-দুরান্ত থেকে লোকজন আসে ঘোল খাওয়ার জন্য। প্রতিদিন বিকেলে এখানে প্রচুর ভীড় হয়। মদন দাদা প্রাকৃতিক উপায়ে অল্প পরিমাণে ঘোল বানায়। তবে যারাই খায়, তারাই তৃপ্তি করে খায়।
ঘোল বিক্রেতা মদন ঘোষ জানান, আমার পূর্বপুরুষ এই ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকায় বংশ পরম্পরায় আমিও এই ব্যবসা করে আসছি। স্বাধীনতার আগে থেকে আমি বাবার সাথে ঘোল বিক্রি করতাম। এখন বয়স হয়ে গেছে, গ্রামে ঘুরতে পারি না তাই বাগমারার ভাটা সংলগ্ন এই তেতুলতলায় বসে ঘোল বিক্রি করি। পথ চলতি মানুষের পাশাপাশি বহু দুর-দুরান্ত থেকে আমার কাছে ঘোল খেতে আসেন। তাছাড়াও মাঠা, মাখন ও খাঁটি ঘি পাওয়া যায় আমার কাছে। ঘোল বিক্রি করে আমি আমার সন্তানদের বড় করেছি। অভাব-অনটনের সংসারে সহযোগিতা করতে এখনও ঘোল বিক্রি করছি।
মদন ঘোষের জীবন যেন পরিশ্রমের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। দাদা ও বাবার হাত ধরে যে পেশার সঙ্গে তাঁর পরিচয়, সেই পেশাকেই আঁকড়ে ধরে কেটে গেছে জীবনের সিংহভাগ সময়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর প্রয়োজন বিশ্রাম, প্রয়োজন স্বস্তি। কিন্তু জীবিকার বাস্তবতা তাঁকে এখনো তেঁতুলগাছের নিচে বসিয়ে রাখে।
জয়রামপুর গ্রামের এই ঘোল বিক্রেতার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সংগ্রাম বয়স মেনে থেমে থাকে না। কারও কাছে তেঁতুলগাছের নিচে বসে ঘোল বিক্রি করা হয়তো খুব সাধারণ দৃশ্য; কিন্তু সেই দৃশ্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে বছরের পর বছরের পরিশ্রম, পারিবারিক ঐতিহ্য আর দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়ে টিকে থাকার এক অসাধারণ মানবিক গল্প। মদন কুমার ঘোষের জীবনের এই গল্প শুধু একজন ঘোল বিক্রেতার গল্প নয়; এটি শ্রমজীবী মানুষের অদম্য মনোবল, দায়িত্ববোধ ও বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াইয়ের প্রতিচ্ছবি।
The post তেঁতুলতলায় ঘোল বিক্রেতা মদন ঘোষের ৫৪ বছরের জীবনসংগ্রাম appeared first on ভোরের চেতনা.
