কাজী জলিল।।
একটি শিশুর নৃশংস মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের স্বপ্নের সমাপ্তি নয়, এটি গোটা সমাজের বিবেকের সামনে দাঁড় করানো এক কঠিন প্রশ্ন। তাজমিন হত্যাকাণ্ড আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কতটা ব্যর্থ এবং আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধ কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রথমেই তাজমিনের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে এই নৃশংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির সর্বোচ্চ আইনানুগ শাস্তি এবং নিরপেক্ষ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানাই।
কিন্তু একটি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানোই কি আমাদের দায়িত্বের শেষ কথা? যে পরিবেশে একটি শিশু নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়, যে সামাজিক বাস্তবতায় তার ঝুঁকিপূর্ণ চলাফেরা নজর এড়িয়ে যায় এবং যে ব্যবস্থায় অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, সেসব বিষয় নিয়েও গভীরভাবে ভাবতে হবে।
প্রকাশিত ও আলোচিত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া তাজমিনের একা কক্সবাজারে যাওয়া, একজন যুবকের সঙ্গে হোটেলে অবস্থান করা এবং গভীর রাতে একা চলাফেরার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। এসব তথ্যের প্রতিটি দিক যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে ঘটনাগুলো সত্য হয়ে থাকলে তা অবশ্যই শিশুটির নিরাপত্তা, অভিভাবকের তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু কীভাবে পরিবারের নজরদারির বাইরে এত দূরে চলে গেল? তার অবস্থান সম্পর্কে অভিভাবকেরা কতটা অবগত ছিলেন? হোটেলে অপ্রাপ্তবয়স্কের পরিচয় ও বয়স যাচাইয়ের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তদন্তের মাধ্যমে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিশুটির পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত আচরণ কোনোভাবেই তাকে হত্যার দায়ী করতে পারে না। কোনো শিশু রাতের রাস্তায় একা থাকলেও, তার পোশাক যেমনই হোক, তাকে নির্যাতন বা হত্যার অধিকার কারও নেই। অপরাধের দায় অপরাধীরই। ভুক্তভোগীর আচরণকে অপরাধের অজুহাত হিসেবে উপস্থাপন করলে ন্যায়বিচারের ধারণাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংস্কৃতি মানুষের জীবনবোধ, রুচি, আচরণ, ঐতিহ্য ও নৈতিকতার সম্মিলিত প্রকাশ। যে প্রবণতা মানুষকে সহিংসতা, অবমাননা, অসহিষ্ণুতা ও দায়িত্বহীনতার দিকে ঠেলে দেয়, তা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু বিদেশি পোশাক, গান কিংবা জীবনযাপনের ধরনকে এককভাবে সামাজিক অপরাধের কারণ হিসেবে দেখাও যুক্তিসংগত নয়। সংস্কৃতির পরিবর্তন এবং অপরাধপ্রবণতা এক বিষয় নয়।
প্রকৃত উদ্বেগের জায়গা হলো—মানুষের প্রতি সম্মান, আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি। একটি ছেলে যদি মনে করে, কোনো মেয়ের পোশাক বা চলাফেরা তাকে অসদাচরণ করার সুযোগ দেয়, তবে সেই মানসিকতাই ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে ছেলেদেরও ছোটবেলা থেকে সম্মতি, মর্যাদা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার শিক্ষা দিতে হবে।
ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ মানুষের মধ্যে সংযম, সহমর্মিতা এবং অন্যের অধিকার রক্ষার চেতনা জাগাতে পারে। কিন্তু মূল্যবোধের শিক্ষা কখনোই ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার হাতিয়ার হতে পারে না। পর্দা বা পোশাক ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ হতে পারে; তবে কোনো নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তার পোশাকের ওপর নির্ভরশীল নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।
শিশুদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদ ব্যবহার শেখানোও জরুরি। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, অনলাইনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং কোনো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়েছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। তবে নজরদারির নামে কঠোর নিয়ন্ত্রণ নয়; প্রয়োজন সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক, খোলামেলা আলোচনা এবং বিপদের কথা নির্ভয়ে জানানোর পরিবেশ।
শিশুদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। তাদের এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা অপরিচিত কারও প্রলোভন, চাপ, প্রতারণা কিংবা নির্যাতনের আশঙ্কা বুঝতে পারে এবং প্রয়োজনে দ্রুত সাহায্য চাইতে পারে। তাজমিনের ঘটনা থেকে অভিভাবকদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তাজমিন হত্যাকাণ্ডের বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। অভিযুক্তের অপরাধ আদালতে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হোটেল ও আবাসিক প্রতিষ্ঠানে অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা, অনলাইন নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং বিপদে সাহায্য চাওয়ার বিষয়ে সচেতনতামূলক শিক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবার, শিক্ষক, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যম—সবারই এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে।
তাজমিনকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে, শিশু সুরক্ষায় কার্যকর পরিবর্তনের পথ দেখায় এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে, তবে সেই উদ্যোগ ভবিষ্যতের বহু শিশুর জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তাজমিনের জন্য ন্যায়বিচার চাই, প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ চাই। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুকে তার পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কারণে দোষারোপ করা হবে না; বরং প্রতিটি শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে সবাই দায়িত্ব পালন করবে।
লেখক: সদস্য সচিব, জাসাস, খুলনা মহানগর।
