ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে অনড় ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। অচিরেই তার অপসারণ এবং নেতাকর্মীদের আটকের প্রতিবাদে আজ শুক্রবার ‘তেরঙ্গা’ মিছিল করবে দলটি। রাজধানী নয়াদিল্লির কনট প্লেসে ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর এই কর্মসূচি হবে। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দ্বীপকে গত বুধবার সামাজিক মাধ্যম এক্সে কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বলেন, জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। শুক্রবারের কর্মসূচির পর তাকেও গ্রেপ্তার করা হতে পারে।
সিজেপির দুই জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার এই মিছিলে অংশ নেওয়া অনিশ্চিত। কারণ যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে ঢুকে ভারতের জাতীয় পতাকা ওড়ানোর পর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সৌরভ ও আশুতোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, তারা নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে
যন্তর মন্তরে ঢুকেছিলেন। পরে তাদের তিহার কারাগারে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়।
এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে অভিজিৎ বলেন, ‘আপনারা জানেন, যন্তর মন্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর জন্য আশুতোষ ও সৌরভকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাই যারা দেশকে ভালোবাসেন, জাতীয় পতাকাকে ভালোবাসেন, তাদের সবাইকে ১৬ অক্টোবর বিকাল ৫টায় কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
কর্মসূচিতে ভারতের জাতীয় পতাকা নিয়ে আসার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান অভিজিৎ। তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের জাতীয় পতাকা ওড়াব। সবাইকে জানিয়ে দেব, এই পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। যারা দিল্লিতে আসতে পারবেন না, তারা নিজ নিজ শহরে তেরঙ্গা মিছিলের আয়োজন করুন। এই স্বৈরাচারীদের জানিয়ে দিন, জাতীয় পতাকা আমাদের গর্ব। এই পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়।’
অভিজিৎ আরও বলেন, এই মিছিলের পর তাকেও গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হতে পারে। তবে তাতে তিনি পিছিয়ে যাবেন না। তার ভাষায়, ‘আমার জাতীয় পতাকা আমার গর্ব। আমি এই কাজ করবই।’
পুলিশ জানিয়েছে, সেন্ট্রাল পার্কে কর্মসূচি পালনের জন্য আয়োজকরা অনুমতি চাননি। এ ধরনের কর্মসূচির জন্য অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এদিকে কর্মসূচিস্থলে ১৬৩ ধারার নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। ফলে সিজেপি এই কর্মসূচি করার অনুমতি পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
নিরাপত্তাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, শুক্রবারও ককরোচ পার্টি ও অন্য তরুণদের দিল্লিতে কোনো আন্দোলন করতে দেওয়া হবে না। যেখানে পতাকা ওড়ানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে সেই সেন্ট্রাল পার্কসহ যন্তর মন্তরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে এবং সেসব জায়গায় কাউকে যেতে দেওয়া হবে না।
এদিকে বৃহস্পতিবার দিল্লিতে একটি প্রেস ব্রিফিং করেছেন অভিজিৎ এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)-এর জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা। এ সময় তারা গত ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরের আন্দোলন নিয়ে কথা বলেন। ওই দিন দেশটির তরুণদের যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়ার কথা থাকলেও ব্যাপক পুলিশ উপস্থিতির কারণে তারা তা পারেননি। যারাই সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তাদের সবাইকে আটক করা হয়েছে। যার মধ্যে অভিজিৎ ও তার অন্যান্য সহযোগীরাও ছিলেন। এ ছাড়া ওই দিন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এবং দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকেও আটক করা হয়।
অভিজিৎ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, এগুলো সব করা হয়েছে শুধু জ্ঞানেশ কুমারকে রক্ষার জন্য। তিনি বলেন, সংগঠন, দিল্লির সব তরুণ রাস্তায় লড়াই করছে। তাদের রাস্তা থেকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নেহাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আয়েশাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, ভিল্লাজকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কার জন্য? জ্ঞানেশ কুমারকে বাঁচানোর জন্য।
অভিজিৎ আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার তার নিজ দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। কেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বাঁচানোর জন্য এত কিছু করা হলো এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বাংলাদেশ নিয়ে নেহার বক্তব্যে উত্তপ্ত ভারতের রাজনীতি : বাংলাদেশের তরুণদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ভারতের জেন-জিরা এখন গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের পক্ষে লড়াই করছেন বলে এক ভিডিও বার্তায় জানান নেহা বোরা। তার এমন বক্তব্য নিয়ে উত্তপ্ত হয়েছে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন।
দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি অভিযোগ করেছে, নেহার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ও তার সহযোগীরা সরকার পতনের চেষ্টা করছে। তারা গণতান্ত্রিক উপায়ের বদলে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে চাইছে। তবে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিরোধী দল কংগ্রেস বলেছে, তরুণদের দমানোর জন্য বিজেপি গণতন্ত্রকে সামনে টেনে আনছে।
বিজেপির মুখপাত্র প্রদীপ ভাণ্ডারি বৃহস্পতিবার নেহার ভিডিও প্রকাশ করে বলেন, ‘রাহুল গান্ধীর পোস্টার গার্ল নেহা বোরা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের (ভোটাধিকারের) পথ দেখিয়েছে’। এটি সরকার পরিবর্তনের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি। রাহুল গান্ধী ও তার সহযোগীরা ভারতের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি।’
তার বক্তব্যের প্রতিবাদে কংগ্রেস নেতা রশিদ আলভি বলেছেন, বিজেপি গণতন্ত্রের কথা বলে, যেখানে কংগ্রেস এই গণতন্ত্রের জন্যই লড়াই করছে। তিনি আরও বলেন, ‘বিজেপি সেই গণতন্ত্রের কথা বলছে, যার জন্য আমরা লড়াই করছি। পুরো দেশ এই গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করছে। কেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চাওয়া হচ্ছে। কারণ তিনি ভারতের গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন।’
নরেন্দ্র মোদি ‘বর্বরতার’ সব সীমা ছাড়িয়ে গেছেন : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ওপর চরম ক্ষোভ ঝেড়েছেন দেশটির জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি। নিজের ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট দিয়ে ধ্রুব রাঠি লেখেন, ‘নরেন্দ্র মোদি বর্বরতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেছেন।’ বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার পর পোস্টটি দেন ধ্রুব রাঠি। পোস্টে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইয়ের একটি ভিডিও ফুটেজ জুড়ে দেন তিনি।
ক্যাপশনে ধ্রুব লেখেন, ‘উনারা হলেন অঙ্কিতা ভাণ্ডারির মা-বাবা। অঙ্কিতা এমন এক তরুণী, যাকে এই একই ব্যবস্থায় হত্যা করেছে। এখন ওরা তার মা-বাবাকেও রেহাই দিচ্ছে না।’
ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের ১৯ বছর বয়সী তরুণী অঙ্কিতা ভাণ্ডারি একটি রিসোর্টে রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। ২০২২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রিসোর্টের মালিক পুলকিত আর্য এবং তার দুই কর্মী সৌরভ ভাস্কর ও অঙ্কিত গুপ্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। চার দিন পর স্থানীয় একটি খাল থেকে অঙ্কিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।
অভিযোগ ওঠে, রিসোর্টে আসা এক প্রভাবশালী অতিথিকে বিশেষ সুবিধা দিতে অঙ্কিতার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তিনি এতে রাজি না হওয়ায় তাকে হুমকি দেওয়া হয়।
এই কথিত অতিথির পরিচয় ঘিরে ‘ভিআইপি’ বিতর্ক তৈরি হয়। অঙ্কিতার পরিবার এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। ২০২৫ সালের ৩০ মে আদালত পুলকিত আর্যসহ তিন আসামিকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। তবে কথিত ভিআইপির পরিচয় ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এখনও আলোচনায় রয়ে গেছে।
মেয়ে হত্যায় ন্যায়বিচার চেয়ে দিল্লিতে বিক্ষোভ করছিলেন অঙ্কিতার মা-বাবা। বুধবার রাতে তাদের আটক করে পুলিশ। তবে বৃহস্পতিবার সকালে ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় নরেন্দ্র মোদিকে নিশানা করে পোস্ট দেন ধ্রুব রাঠি।
ইমরান খানকে ভারত ছাড়ার নির্দেশ : বিক্ষোভে অংশ নেওয়ায় অভিনেতা ইমরান খানকে ২৮ অক্টোবরের মধ্যে ভারত ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির পুলিশ। ইমরান খান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তার কাছে ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া (ওসিআই) কার্ড রয়েছে, যা ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের ভারতে ভ্রমণ ও বসবাসের সুযোগ দেয়। তবে এই কার্ডধারীরা ভারতে ভোট দিতে বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না।
বৃহস্পতিবার পুলিশের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আইন লঙ্ঘনের দায়ে ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) ইমরান খানকে একটি নোটিশ দিয়েছে। অভিনেতা এখন পর্যন্ত নোটিশের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। গত ১০ অক্টোবর সিজেপির ডাকা এক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেন ইমরান খান।
সুপ্রিমকোর্টে স্বরাষ্ট্র সচিবের নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা : জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে সিজেপির আন্দোলন রুখতে দিল্লি অবরুদ্ধ হওয়ায় সুপ্রিমকোর্টের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র সচিব গোবিন্দ মোহন। সুপ্রিমকোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় তিনি বলেন, ৯ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তা ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করা হয়নি। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা ও অশান্তি এড়াতে যাবতীয় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।
এদিকে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের সুপ্রিমকোর্ট অভিযান ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে মামলা করেছেন বিজেপির মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া। ার অভিযোগ, এভাবে রাজনীতির স্বার্থে বিচার বিভাগকে নিশানা করা সমর্থনযোগ্য নয়। ওই মামলায় নোটিশ পাঠানো হয়েছে রাহুল গান্ধী ও সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবকে।’ ইন্ডিয়া টুডে, টাইমস অব ইন্ডিয়া।
