ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার বিরুদ্ধে স্বর্ণ ও হীরা কেনাবেচায় প্রায় ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ টাকার লেনদেনের উৎস নিয়ে অর্থপাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ওই মামলায় তাঁর এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর আগে জুলাই আন্দোলনের সময় গুলিতে এক আন্দোলনকারী আহত হওয়ার ঘটনায় উত্তরা পশ্চিম থানার মামলাতেও তাঁকে আসামি করা হয়েছে।
গত ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানী থেকে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন ২০ অক্টোবর তাঁকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়।
অর্থপাচারের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক মো. আশরাফুল হাসান জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড চান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলামের আদালত এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন এবং জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, মামলার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা এবং অর্থপাচারের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য তাঁকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষ রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি দেয়। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল ও জামিন চেয়ে আবেদন করেন।
মামলার অভিযোগ
মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি করা হয় ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর, গুলশান থানায়। বাদী সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ও অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিটের পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান শেখ।
এজাহার অনুযায়ী, ২০০৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে গুলশান অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডের শোরুম ও কার্যালয়কে কেন্দ্র করে অপরাধ সংঘটিত হয়।
সিআইডির অনুসন্ধানে পাওয়া ব্যাংক হিসাব, নথিপত্র এবং জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে এজাহারে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি বৈধভাবে ঋণপত্র (এলসি) খুলে বিদেশ থেকে ৩৮ কোটি ৪৭ লাখ ৪৮ হাজার ১১ টাকা ৫২ পয়সার স্বর্ণবার, স্বর্ণালংকার, লুজ ডায়মন্ড ও অন্যান্য অলংকার আমদানি করেছে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি ১৯ লাখ ১৪ হাজার ১৪ টাকার স্বর্ণ ও হীরা কেনা, বিনিময় বা রূপান্তর করা হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
সিআইডির অভিযোগ, স্থানীয় বাজার থেকে কেনা এসব স্বর্ণ ও হীরার বিক্রেতা এবং মূল উৎস সম্পর্কে বৈধ নথিপত্র তদন্ত কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করা যায়নি। তদন্ত সংস্থার ধারণা, এসব পণ্যের একটি অংশ চোরাচালানের মাধ্যমে দেশে এসে থাকতে পারে।
আদালতের আদেশের পর তদন্তে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা স্বর্ণ ও হীরার উৎস, সরবরাহকারীদের পরিচয়, লেনদেনের অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের যথার্থতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উত্তরা পশ্চিম থানার মামলা
উত্তরা পশ্চিম থানার মামলা নম্বর ৫৭, তারিখ ২৭ মার্চ ২০২৫। এ মামলায় দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩০৭, ৩২৬, ১০৯ ও ১১৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এজাহারে দিলীপ কুমার আগরওয়ালাকে ৩১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে বাদীও আন্দোলনে অংশ নেন। পরে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে আন্দোলনকারীরা উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিএনএস সেন্টারের পশ্চিম পাশে অবস্থান নেন।
আবেদনে অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে এজাহারনামীয় কয়েকজন আসামির নির্দেশে দিলীপ আগরওয়ালাসহ অন্য আসামিরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বেআইনি জনতাবদ্ধে সশস্ত্র হামলা চালান এবং আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এতে বাদীর কোমরের ওপরের অংশে, মেরুদণ্ডের নিচের দিকে গুলি লাগে। তিনি ঘটনাস্থলে অচেতন হয়ে পড়লে সহ-আন্দোলনকারীরা তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।
পুলিশের আবেদনে আরও বলা হয়, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বাদী দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে থানায় অভিযোগ করলে মামলাটি নথিভুক্ত হয়।
উত্তরা পশ্চিম থানার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. সুমন মিয়া আদালতে দাখিল করা আবেদনে দিলীপ আগরওয়ালাকে ১০ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, মামলার ঘটনাস্থলে তাঁর উপস্থিতি এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার দাবি করে পুলিশ।
মামলার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, তাঁদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ এবং ঘটনার সময় ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আগের গ্রেপ্তার
দিলীপ আগরওয়ালাকে এর আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) তাঁকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন জুলাই আন্দোলনের সময় ঢাকার বাড্ডায় কিশোর হৃদয় আহমেদ হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং ওই মামলায় তাঁর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
পরবর্তী সময়ে তাঁকে আরও কয়েকটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি জামিন পান এবং ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর কারাগার থেকে মুক্তি পান।
রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসা নিয়ে আলোচনা
ব্যবসায়ী পরিচয়ের পাশাপাশি দিলীপ আগরওয়ালা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। ২০২৩ সালে গঠিত দলটির উপকমিটিতে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ওই বছরের নভেম্বরে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবেও তাঁর নাম আলোচনায় আসে।
তবে দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার মাত্রা কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগের ফলে ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ সুবিধা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।
দিলীপ আগরওয়ালার ব্যবসা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে বিতর্ক ও অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে আসল হীরার নামে অন্য পাথর বিক্রি এবং আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠার বিষয়ও রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল।
অনুসন্ধানে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে রয়েছে। আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্যবিষয়ক উপকমিটিতে তাঁর অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া কী ছিল? দলীয় পদ পাওয়ার পর ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিশেষ সুবিধা তৈরি হয়েছিল কি না? সরকারি সংস্থা, আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া, শুল্ক ব্যবস্থাপনা কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনে রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো প্রভাব পড়েছিল কি না?
এই মুহূর্তে দিলীপ আগরওয়ালাকে ঘিরে দুটি পৃথক তদন্তের বিষয় সামনে এসেছে। একটি জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলা, অন্যটি স্বর্ণ-হীরা কেনাবেচা ও অর্থপাচারের অভিযোগ। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো অনিয়মের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নির্ভর করবে প্রামাণ্য নথি, তদন্তের ফলাফল ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
বিআলো/শিলি