মোর্শেদ মারুফ
ঘুষ আর দুর্নীতির মাধ্যমে জাল দলিলের রমরমা বাণিজ্যের মহা নায়ক, চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদা উপজেলার জগন্নাথপুরের শফিকুল ইসলাম।
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার (ডি.আর) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তিনি যেন লুটপাট বাণিজ্যের সম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তার প্রধান সহকারীর শিহাবের মাধ্যমে।
ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় এবং অধীনস্থ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে বিভিন্ন সময়ে জমি নিবন্ধন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, এবং ভূয়া কাজী বা লাইসেন্স ভাড়ার মাধ্যমে কাবিননামা সংক্রান্ত কাজে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
জেলা রেজিস্ট্রোর শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ ও রাজস্ব ফাঁকির বিভিন্ন অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত চলমান থাকাকালীন তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায় কোন এক কালো শক্তির থাবায়।
সরকার ইতিমধ্যে লটারির মাধ্যমে সাব-রেজিস্ট্রারদের বদলি এবং কঠোর তদারকির ব্যবস্থা চালু করেছে। কাবিননামা বা বিবাহ নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক হয়রানি বা ঘুষের শিকার না হন, সেজন্য সরকার নির্ধারিত ফি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিবাহ নিবন্ধন (কাবিননামা) ফি: কোনো কাজী বা নিকাহ্ রেজিস্ট্রার নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করতে পারবেন না।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক বিধিমালা অনুযায়ী সংশোধিত ফি: দেনমোহরের ওপর ভিত্তি করে ফি: প্রথম ৫ লক্ষ টাকা দেনমোহরের জন্য প্রতি ১ হাজার টাকায় ১৪ টাকা হারে ফি: প্রযোজ্য।
উচ্চ দেনমোহরের ক্ষেত্রে: ৫ লক্ষ টাকার বেশি দেনমোহর হলে, পরবর্তী প্রতি ১ লক্ষ টাকার জন্য অতিরিক্ত ২০০ টাকা হারে ফি দিতে হবে।
সর্বনিম্ন ফি: দেনমোহরের পরিমাণ যতই কম হোক না কেন, বিবাহ নিবন্ধনের সর্বনিম্ন ফি ২০০ টাকা, অন্যান্য সরকারি ফি: বিবাহ নিবন্ধনের মূল বই থেকে নকল (সার্টিফাইড কপি) তোলার সরকারি ফি ৫০ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে কাবিন সংশোধনের কাজে ঢাকা জেলার রেজিস্টার শফিকুল ইসলামের প্রধান সহকারী শিহাবকে দিয়ে-২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শুধু কাবিন সংশোধন নয় তথ্য রয়েছে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের অধীনে জেলা সদর সহ ছোট-বড় সব মিলিয়ে প্রায় ২১টির মতো সাব-রেজিস্ট্রি অফিস রয়েছে।
এসব অফিস থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার দলিল সম্পাদিত হয়, অভিযোগ রয়েছে, তিনি তার প্রধান সহকারী শিহাবের মাধ্যমে মাস শেষে দলিলপ্রতি-২,৫০০ টাকা হারে চা খরচ দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে নিয়মিত ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করার সিন্ডিকেট রয়েছে, ৫ হাজার টাকা ঘুষ না দিলে সাধারণ মানুষের দলিল বাতিলেরও হুমকি দেওয়ার মতো জঘন্যতম কাজগুলো তারা করে থাকেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও প্রভাবশালী আন্ডার গ্রাউন্ডের মাফিয়া, শফিকুল ইসলামের দুর্নীতির মাধ্যমে মেহেরপুর ও ঝিনাইদহের মহেশপুর সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়, পরবর্তীতে তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রী, ফরহাদ হোসেনকে ম্যানেজ করে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে নাটোর জেলায় যোগদান করেন, এরপর থেকেই নামে-বেনামে গড়ে তুলেন অবৈধ সম্পদের পাহাড়।
জেলা রেজিস্টার শফিকুল ইসলাম, ৫ই আগস্ট-২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর আইজিআর অফিসের অনুমতি ছাড়াই তিনি আত্মগোপনে চলে যান, পরবর্তীতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ১০ অক্টোবর ফরিদপুর জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদান করেন।
সেখানেও তাঁর ছত্রছায়ায় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে দুর্নীতির মহোৎসব চলে, যা পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার নজরে আসে এবং দুদকের মামলা পর্যন্ত গড়ায়। শফিকুলের সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদকে) অভিযোগ থাকলেও তা রহস্যজনক কারণে তা ধামাচাপা পড়ে যায়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ঢাকার রাজধানী কল্যাণপুরে ড্রিম হ্যাভেন ভবনে (বাসা নাম্বার-১২, রোড নম্বর-০২, ওয়ার্ড নম্বর-১১) বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং মোহাম্মদপুরে বাড়ি, সেই সাথে তার স্ত্রী সুরাইয়া ইসলামের নামে একটি অত্যাধুনিক গাড়ি রয়েছে যার নাম্বার (ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৬১৬৬)
নিজ জেলা চুয়াডাঙ্গা সদরের কাঠপট্টি এলাকায় চারতলা বাড়ি, কার্পাসডাঙ্গা বাজারে মার্কেটসহ চারতলা ভবন, আট কবর এলাকায় মার্কেটসহ দোতলা ভবন এবং জগন্নাথপুরে বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি।
অন্যান্য জেলায় রয়েছে একাধিক বাড়ি এবং মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার আনন্দবাস গ্রামে ভাইয়ের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, ব্যবসা ও নামে-বেনামে ব্যাংক একাউন্টে ভাগিনা মোঃ হুমায়ুন আহমেদের মাধ্যমে পরিচালিত কোটি টাকার নেহা ত্বহা ট্রেডার্স নামের প্রতিষ্ঠান।
তদবিরের মাধ্যমে তিনি ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসাবে পদায়ন বাগিয়ে নেন এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪ সেপ্টেম্বর-২০২৬-এর তালিকায় তাকে ফরিদপুর দেখানো হলেও, ৬ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দুদকের অভিযানের সময় তিনি নিজেই ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন।
এবিষয়ে জানতে চাইলে তাকে অফিসে এবং ফোনে পাওয়া যায়নি, সাধারণ মানুষের প্রশ্ন দুর্নীতি থাকা সত্ত্বেও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই কর্মকর্তার খুঁটির জোর কোথায়?
The post দুর্নীতির আখড়া ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়: আলোচনায় শফিকুল ইসলাম appeared first on দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ.
