ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ভোটার তালিকায় নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির অপেক্ষায় থাকা লাখ লাখ মানুষের মধ্যে মুসলিম নামধারীদের আবেদন খারিজ হওয়ার হার বেশি। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে খারিজ হওয়া ৬ হাজার ৪৪৪টি আপিল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৮০ দশমিক ২ শতাংশ আবেদনকারীর নাম মুসলিম। কয়েকটি নির্বাচনি এলাকায় এ হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যারের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ এপ্রিল থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা ৬ হাজার ৪৪৪টি আপিল খারিজ করেছেন আপিল ট্রাইব্যুনালগুলো।
পশ্চিমবঙ্গের গবেষক, বিশ্লেষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিয়ে গঠিত স্বতন্ত্র সংগঠন ‘সিভিক রিসার্চ গ্রুপ’ এসব সিদ্ধান্তের বিস্তারিত তথ্য দ্য ওয়্যারের কাছে সরবরাহ করে। নামের ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খারিজ হওয়া আবেদনকারীদের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের চারজনের নাম মুসলিম। তবে আবেদনকারীদের ধর্মীয় পরিচয়ের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় এ হিসাবকে আনুমানিক পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
যেসব ১২৯টি নির্বাচনি এলাকায় আপিল খারিজের ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ভোটার তালিকায় সংখ্যালঘুদের অংশ প্রায় ২২ শতাংশ।
জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানেও এ প্রবণতা দেখা গেছে। হুগলি জেলায় মোট ভোটারের প্রায় ১৫ শতাংশ সংখ্যালঘু হলেও খারিজ হওয়া আপিলের ৮৩ শতাংশই মুসলিম নামধারীদের। খানাকুল আসনে খারিজ হওয়া ৮৩১টি আবেদনের মধ্যে ৯৬ দশমিক ৫ শতাংশ আবেদনকারীর নাম মুসলিম। ওই আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের হার প্রায় ২০ শতাংশ।
বোলপুরে খারিজ হওয়া ৮০৮টি আবেদনের ৮৮ শতাংশ, রায়গঞ্জে ৬৫৯টি আবেদনের ৯২ শতাংশ এবং সবংয়ে ২৩৪টি আবেদনের ৮৮ শতাংশ মুসলিম নামধারীদের। সবংয়ে সংখ্যালঘু ভোটারের হার ৭ শতাংশেরও কম।
যেসব ৫১টি নির্বাচনি এলাকায় অন্তত ২০টি করে আবেদন খারিজ হয়েছে, তার মধ্যে ৩২টিতে খারিজ হওয়া আবেদনকারীদের অন্তত ৮০ শতাংশের নাম মুসলিম বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। পাঁচটি নির্বাচনি এলাকাতেই মোট খারিজ হওয়া আবেদনের প্রায় ৪৪ শতাংশ ঘটেছে।
তবে খারিজ হওয়া আপিলের এই পরিসংখ্যান পুরো পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে না। ট্রাইব্যুনালগুলোতে মূলত দুই ধরনের আপিলের শুনানি হচ্ছে।
একদিকে, বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ২২ লাখ মানুষ নিজেদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন করেছেন। অন্যদিকে, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা যেসব ভোটারকে বৈধ বলে গণ্য করেছিলেন, তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে প্রায় ১৬ লাখ আপিল করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩৮ লাখ আপিল জমা পড়েছে। কিন্তু প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে মাত্র এক লাখের কিছু বেশি আবেদনের নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে আবেদনকারীদের ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে।
মালদা জেলায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার আপিল জমা পড়লেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশের। ফলে আবেদনকারীদের অনেকের কাছেই এখন বড় প্রশ্ন, তাঁদের আবেদন মঞ্জুর বা খারিজ হয়েছে কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—তাদের বক্তব্য আদৌ শোনা হচ্ছে কি না।
আপিলের শুনানি ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন জেলার ট্রাইব্যুনালগুলোর মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা গেছে। পূর্ব বর্ধমানের একটি বেঞ্চে শুনানি হওয়া মামলার ৮৫ শতাংশ খারিজ হয়েছে। অন্যদিকে, উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া ও দক্ষিণ দিনাজপুরের বেঞ্চগুলো কোনো আবেদনই খারিজ করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ৮০ দশমিক ২ শতাংশের পরিসংখ্যানটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি মূলত যেসব ভোটার নিজেদের নাম পুনরায় তালিকাভুক্ত করার আবেদন করেছিলেন এবং যাদের আবেদন শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়েছে, তাদের নামের ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণ। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে করা প্রায় ১৬ লাখ আপিলের ফলাফল এ হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এ ছাড়া আবেদনকারীদের প্রত্যেকের ধর্মীয় পরিচয়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য না থাকায়, ট্রাইব্যুনালগুলো বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আবেদনকারীদের সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করেছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার সময় প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের তথ্য ‘যৌক্তিক অসংগতি’র কারণে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আনা হয়েছিল। এর মধ্যে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা ২৭ লাখ ১৬ হাজার ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেন।
এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মোট ১৯টি ট্রাইব্যুনালের প্রতিটির নেতৃত্বে রয়েছেন হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক। প্রতিটি জেলার আপিল নির্দিষ্ট একটি বেঞ্চে পাঠানো হয়।
সব ট্রাইব্যুনাল কলকাতায় অবস্থিত হওয়ায় মালদা ও কোচবিহারের মতো দূরবর্তী জেলার ভোটারদের শুনানিতে অংশ নিতে কয়েক শ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। প্রধান নির্বাচনি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, আপিলের মাধ্যমে যাঁদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সিদ্ধান্ত হবে, তাঁদের নাম কেবল ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোর জন্য ভোটার তালিকায় যুক্ত করা হবে।
অধিকাংশ এলাকায় মুসলিম নামধারীদের আবেদন খারিজের হার বেশি হলেও দক্ষিণ দিনাজপুরে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। জেলাটিতে খারিজ হওয়া ২১৫টি আবেদনের প্রায় ৯৮ শতাংশ আবেদনকারীর নাম হিন্দু বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশের পদবি সাধারণত তফসিলি জাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
বালুরঘাটে খারিজ হওয়া ৬৩টি আবেদনের মধ্যে একজনও মুসলিম নামধারী আবেদনকারী ছিলেন না। গঙ্গারামপুরে ৫৭টি, তপনে ৩৯টি এবং কুশমণ্ডিতে ২৫টি আবেদন খারিজ হয়েছে। এসব এলাকার প্রতিটিতে খারিজ হওয়া আবেদনের ৯০ শতাংশের বেশি হিন্দু নামধারীদের।
এ ছাড়া কোচবিহার উত্তরে খারিজ হওয়া ৩৫টি আবেদনের ৭৪ শতাংশ, উত্তরপাড়ায় ৫৯টির মধ্যে ৭৬ শতাংশ, খড়গপুর সদরে ৩১টির মধ্যে ৭৪ শতাংশ এবং চুঁচুড়ায় ৮৫টির মধ্যে ৬২ শতাংশ আবেদনকারী হিন্দু নামধারী।
সামগ্রিকভাবে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন ও আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় একদিকে বিপুলসংখ্যক আবেদন অনিষ্পন্ন রয়েছে, অন্যদিকে নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনগুলোর মধ্যে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। তবে নামের ভিত্তিতে করা এ বিশ্লেষণ দিয়ে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে ধর্মীয় বৈষম্য হয়েছে কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
