লাদাখের ২৮টি কৌশলগত স্থানের নাম ভারতের সরকারি মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে চীন। জবাবে নয়াদিল্লি বলেছে, লাদাখ ভারতের ‘অবিচ্ছেদ্য ও অখণ্ড অংশ’।
গত ২ অক্টোবর লাদাখের ২৮টি কৌশলগত স্থান আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করে ভারত। এর মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে উত্তেজনার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গোগরা ও হট স্প্রিংসও রয়েছে।
লাদাখ প্রশাসনের সঙ্গে পরামর্শ করে ভারত সরকার এ পদক্ষেপ নিয়েছে। এর উদ্দেশ্য সরকারি মানচিত্র প্রণয়নের প্রক্রিয়াকে আরও সুশৃঙ্খল করা, স্থানগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান চিহ্নিত করা এবং সংবেদনশীল সীমান্ত অঞ্চল সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের সার্ভে অব ইন্ডিয়ার মানচিত্রে এসব স্থান আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করার লক্ষ্য হলো সেগুলোকে নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো।’
গোগরা ও হট স্প্রিংস ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান। ২০২০ সালে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে সংঘাতের সময় এ দুটি এলাকা উত্তেজনার কেন্দ্রে ছিল। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারতীয় সেনাদের টহলের জন্যও স্থানগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, ‘পুনরায় স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে, লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চীনের পক্ষ থেকে যতই অস্বীকৃতি জানানো হোক না কেন, এ প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।’
ভারতের চিহ্নিত করা অন্য স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আলিশা গিরি, ব্রাংসা, চাপচিঙ্গাল গিরিপথ, কানিশকা শৃঙ্গ, কারুন পীর পর্বত, কুকসেল, মার্তণ্ড গিরি, পারপিক হিমবাহ, স্কামরি হিমবাহ, শাচমিরিক গিরিপথ, শকোরগা উপত্যকা, জোরাওয়ার শৃঙ্গ, দেহরা কম্পাস ও দ্রাক কার্পো।
তালিকায় আরও রয়েছে জোলমোরি, কুমারায়না পয়েন্ট, পাংলুং, রিনচেন জাংপো, শাক্যশ্রী গিরি, গুরু রিনপোচে, শামাল লুংপা, ইয়াংপা নদী, মারপা লোৎসাভা রি, মিলারেপা কাংরি, শিব রি ও মহেশ্বর রি। শামাল লুংপা ১৯৫০-এর দশকে টহল ও সেনা মোতায়েনের পথে ব্যবহৃত হতো।
ভারতের এ পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং দাবি করেছেন, লাদাখের এসব স্থানের নামকরণ অবৈধ। মঙ্গলবার চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের বরাতে তার এ বক্তব্য প্রকাশিত হয়।
মাও নিং বলেন, ‘ভারত একতরফা ও অবৈধভাবে যে তথাকথিত লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছে, চীন তা কখনো স্বীকৃতি দেয়নি। ভারতের তথাকথিত মানসম্মত নাম ঘোষণারও দৃঢ় বিরোধিতা করে চীন। এ পদক্ষেপ অবৈধ ও অকার্যকর। চীন-ভারত সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলের সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো সব সময় চীনের অংশ ছিল—এ বাস্তবতা এতে পরিবর্তন হবে না।’
ভারতের সরকারি মানচিত্রে ২৮টি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভৌগোলিক অবস্থান নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে নয়াদিল্লি অঞ্চলটির প্রশাসনিক স্পষ্টতা ও ভূখণ্ডগত অবস্থান তুলে ধরেছে।
২০২০ সালের জুনে পূর্ব লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সেনারা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৫ সালের পর দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সেটিই ছিল প্রথম প্রাণঘাতী সামরিক সংঘর্ষ। ওই ঘটনায় ভারতের অন্তত ২০ জন এবং চীনের চার সেনা নিহত হন।
সংঘর্ষের পর উচ্চপর্যায়ের সামরিক পর্যায়ে এক ডজনের বেশি দফা আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশ সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা অচলাবস্থার পর সংঘর্ষস্থলের আশপাশ থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা নিয়ে ভারত ও চীন নিয়মিত একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে। সীমান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। সূত্র: এনডিটিভি