চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের নতুন সম্ভাবনার মধ্যে নতুন সেতু ব্যবহার করে চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে পৌঁছেছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ইয়ালু নদীর ওপর নির্মিত চার লেনের সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর প্রায় এক সপ্তাহ পর কিমের এ যাত্রার খবর সামনে এল।
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার বাণিজ্যিক ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে নতুন সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও উত্তর কোরিয়ার অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্কসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রস্তুত না থাকায় এটি চালু করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। অবশেষে সেতুটি চালু হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াত আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটি পিয়ংইয়ংকে অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনও দিয়ে থাকে। ফলে নতুন সেতুর কার্যক্রম শুরু হওয়াকে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার সামরিক অভিযানে সহায়তা দিতে উত্তর কোরিয়া সেনা পাঠিয়েছে। এর বিনিময়ে দেশটি অর্থনৈতিক সুবিধা ও সামরিক প্রযুক্তি পেয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের সহযোগিতার সব দিক স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নতুন সেতু চালুর আগে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার প্রথম সড়ক সেতুও চালু হয়। পরপর এসব যোগাযোগ অবকাঠামো চালু হওয়ায় উত্তর কোরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিও এ অঞ্চলের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশটি নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে এবং সরকার বারবার জানিয়েছে, এ অস্ত্রভাণ্ডার ত্যাগ করার পরিকল্পনা তাদের নেই।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন। গত সেপ্টেম্বরে তিনি ইঙ্গিত দেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি একবারে সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরিবর্তে প্রাথমিক পর্যায়ে তা স্থগিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, এমন পদক্ষেপের ফলে পিয়ংইয়ং পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ না করেই নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, চীনও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অবস্থান নিয়ে আগের তুলনায় কম প্রকাশ্য আপত্তি জানাচ্ছে। গত জুনে পিয়ংইয়ংয়ে কিম জং উন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বৈঠকের পর প্রকাশিত বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ অনুপস্থিতিকে চীনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায় না।
কিমের চীন-সংশ্লিষ্ট যাত্রার সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। সোমবার বেইজিংয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পঞ্চম পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। এতে শি চিনপিংসহ দেশটির শীর্ষ নেতারা অংশ নেবেন। কিমের এ যাত্রার সঙ্গে ওই অধিবেশনের কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে নতুন সেতুর ব্যবহার চীন ও উত্তর কোরিয়ার যোগাযোগ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্কের সম্ভাবনাকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক কর্মসূচি, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে এ অঞ্চলের কূটনৈতিক সমীকরণও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে।
-20261024113152.jpg&w=1440&q=75)