তরুণ বয়সের জীবন সাধারণত নিত্যনতুন মাইলফলক, চমৎকার মুহূর্ত এবং ভবিষ্যতের অফুরন্ত উদ্দীপনায় ভরপুর থাকে।
বিপরীতে, জীবনের মধ্যভাগ বা বার্ধক্যে পৌঁছালে, অভিজ্ঞতাগুলো শারীরিক সক্ষমতার হ্রাস থেকে শুরু করে মানসিক সংকটের দিকে ধাবিত করে।
তবে মনস্তত্ত্ব ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, যদি নিজের জীবনের পরিস্থিতির ওপর মনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে, তবে বয়স বৃদ্ধি বা বার্ধক্য কখনই একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা হতে পারে না।
মনস্তত্ত্ব-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘সাইকোলজি টুডে’-তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আচরণ বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক শান্তি, তৃপ্তি ও সুখ ধরে রাখার আসল গোপন চাবিকাঠি হল নিজের জীবনের ওপর ‘পারসিভড কন্ট্রোল’ বা নিয়ন্ত্রণের একটি দৃঢ় মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতি বজায় রাখা।
জার্মানির জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মারিয়া ভির্থ, আন্না এলেনা কর্নাড এবং ক্লাউস রথারমুন্ড-এর ২০২৬ সালের একটি নতুন এবং বড় ক্লিনিক্যাল পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সুখে থাকার মনস্তাত্ত্বিক কৌশল সম্পর্কে জানানো হল।
বয়স কেবলই একটি সংখ্যা
গবেষক মারিয়া ভির্থ ও তার দল ৫০ থেকে ৯১ বছর বয়সি ২৬৮ জন মধ্যবয়সী এবং প্রবীণ মানুষের ওপর একটি বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা চালান।
সেখানে দেখা গেছে, শেষ বয়সে এসে মানুষ যখন কেবল তার শারীরিক ও মানসিক ‘ক্ষতি’ বা হারানো জিনিসগুলোর দিকে তাকায়, তখন তার সুখের মাত্রা ও ‘ওয়েল-বিয়িং’ বা ভালো থাকার ইচ্ছা কমে যায়।
তবে এই নেতিবাচক প্রভাবকে সম্পূর্ণ রুখে দিতে পারে ‘পারসিভড কন্ট্রোল’ বা নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, বয়সের কারণে শারীরিক সক্ষমতা কমে গেলেও যেসব মানুষের মনে এই বিশ্বাস ছিল যে— তারা এখনও তাদের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাদের সুখের মাত্রা তরুণদের মতোই অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
বার্ধক্যের ক্ষতিকে বাস্তবসম্মতভাবে চেনা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক, মানসিক এবং আর্থিকভাবে বিভিন্ন পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে হয়।
মারিয়া ভির্থের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেকেই বয়স বাড়ার ভয়ে বা আঘাতের আশঙ্কায় নিজের পছন্দের শারীরিক সক্রিয়তা বা আনন্দদায়ক সামাজিক ক্রিয়াকলাপগুলো বন্ধ করে দেন।
এই স্বেচ্ছায় গুটিয়ে নেওয়ার মানসিকতা, আত্মপরিচয় বা ‘কনসেপ্ট অব সেলফ’-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে আর দৈনন্দিন আনন্দকে স্তব্ধ করে দেয়।
এর বিপরীতে, নিজের বয়সকে মেনে নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক জীবনের প্রশংসা করা মানসিক দীর্ঘায়ু বা ‘লনজেভিটি’ বাড়িয়ে দেয়।
জীবনের বর্ণনার নিয়ন্ত্রণ এবং পরম তৃপ্তি
গবেষকদের মতে, একজনের জীবনযাত্রার মান কেমন হবে সেটা নির্ভর করে নিজের পরিস্থিতিকে কীভাবে বর্ণনা করছে তার ওপর।
কেউ যদি মনে করে সে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বা ভাগ্যের হাতের পুতুল, তবে তার মনে দুঃখ ও বার্ধক্যের চাপ বেশি জাঁকিয়ে বসে।
অন্য দিকে, উচ্চমাত্রার নিয়ন্ত্রণ বা ‘কন্ট্রোল’ থাকলে মানুষ যেকোনো বয়সের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে একটি ইতিবাচক উদ্দীপনা খুঁজে পায়। এটি বার্ধক্যজনিত নেতিবাচক কুসংস্কার ও একাকিত্ব দূর করতে সাহায্য করে।
জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত প্রজ্ঞা, পরিপক্কতা, ধৈর্য ও বিশ্বস্ততা স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে এবং প্রাকৃতিকভাবেই মনকে সুখী রাখতে ভূমিকা পালন করে।
