পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও নদীতে ইলিশ শিকার ও গোপনে বেচাকেনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, উপজেলার বিভিন্ন নদী ও চরাঞ্চলের অন্তত ১০ থেকে ১৫টি স্থানে দালাল ও নির্ধারিত ক্রেতাদের মাধ্যমে নিষিদ্ধ সময়ে ধরা ইলিশ কেনাবেচা চলছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের আঁধারে নদীতে জাল ফেলে ইলিশ ধরা হচ্ছে। দিনের বেলায়ও কোথাও নৌকা নিয়ে মাছ শিকার চলছে। আবার নির্দিষ্ট ক্রেতার ফোন পেলে ব্যাগে করে মাছ পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অপরিচিত কেউ মাছ কিনতে চাইলে আগে তাঁর পরিচয় যাচাই করা হয় বলেও জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। গত তিন দিন বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট ও বড় শিবা; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চরআগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট ও চরবাংলা এলাকায় অবৈধভাবে ইলিশ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট, সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা, পানপট্টি লঞ্চঘাট, বটতলা বাজার, বোয়ালিয়া ও পক্ষিয়া স্লুইসগেট, লোন্দা স্লুইসগেট এবং গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানের নাম উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রামনাবাদ, তেঁতুলিয়া ও আগুনমুখা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টেও রাতের আঁধারে জাল ফেলা হচ্ছে। প্রশাসনের টহল নৌকা দেখলে কিছু জেলে দ্রুত সরে গিয়ে ধানক্ষেত কিংবা বনের ভেতরে আশ্রয় নেন বলেও দাবি তাঁদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এসব কারবারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকে ভয় পান। মাছ শিকার ও পরিবহনের সময় ছবি বা ভিডিও ধারণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের। মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনকে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, চরবিশ্বাস ইউনিয়নের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র তাঁদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ, ডাকচিৎকার ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এ ঘটনায় নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে দুর্গম চরাঞ্চলে নজরদারি বাড়ানো এবং অভিযানসংক্রান্ত তথ্য আগেভাগে ফাঁস হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১২ দিনে ৩৮টি অভিযান ও চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে মাছ ও জাল জব্দের পাশাপাশি মামলা, কারাদণ্ড ও জরিমানার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দপ্তরটি।
মৎস্য অফিসের তথ্যে ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা এবং মোট ২০ হাজার টাকা জরিমানা করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জব্দ করা মাছ ও জালের পরিমাণসংক্রান্ত তথ্যে অসংগতি রয়েছে; এ বিষয়ে দপ্তরের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট তথ্য প্রয়োজন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, “মৎস্য অফিস ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গলাচিপার অনেক এলাকা দুর্গম ও প্রত্যন্ত হওয়ায় সব জায়গায় দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তবে এসব এলাকাতেও অভিযান চালানো হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযানের সময় একটি সংঘবদ্ধ চক্র বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান, নদীপথে নজরদারি এবং অবৈধভাবে মাছ ধরা ও বিক্রির অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, ইলিশের প্রজনন রক্ষা এবং বৈধভাবে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
The post গলাচিপায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা, নদীতে ইলিশ শিকারের মহোৎসব appeared first on ভোরের চেতনা.
