সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে দফায় দফায় পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পেছনে ফজলুল হজ আমিনী নামের এক ব্যক্তির উসকানির তথ্য পাওয়া গেছে। নিজের নামের সঙ্গে ‘মুফতি’ উপাধি ব্যবহার করা এই ব্যক্তি স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকারও করেছেন। তিনি হত্যাকাণ্ডের দিন মঙ্গলবার দুপুর থেকেই শামীমের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মবের ডাক দেন। পরে শামীমের মরদেহের ছবিসহ উচ্ছ্বাসও প্রকাশ করেন আমিনী। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ তাকে আটক করেনি। এর
মধ্যে নিহতের পরিবারের অভিযোগ করেছে, শামীমকে ‘পরিকল্পিতভাবে’ হত্যা করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। সাতক্ষীয়রায় আমাদের সময়ের নিজস্ব প্রতিবেদক ও বিবিসি বাংলার পৃথক প্রতিবেদনে এ সব তথ্য জানা গেছে।
বিবিসির বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, সাতক্ষীরার দেবহাটায় দফায় দফায় মারধরের শিকার হয়ে মারা গেছেন ওয়াহিদুজ্জামান শামীম। মঙ্গলবার রাতে তার মৃত্যু হয়। তবে পরদিন বুধবার এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর থেকে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ : নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওছিফ রহমান সাগর বিবিসি বাংলাকে বলেন, উসকানিমূলক একটি ভিডিও দিয়ে শামীমের বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলে ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে মারা হয়েছে। শামীমকে মানসিক ভারসাম্যহীন দাবি করে সাগর বলেন, ‘আইন যদি তাকে শাস্তি দিত তাহলে আমরা মেনে নিতাম। কিন্তু আমার ভাইকে এভাবে বিনা বিচারে পিটায় মারবে কেন?’
জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ : ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সোমবার প্রথম দফায় শামীমের বাড়িতে হামলা করা হয় বলে জানান তাওছিফ রহমান সাগর। এ সময় স্থানীয় জামায়াতের একদল নেতাকর্মী লোকজন জড়ো করে মব সৃষ্টি করে বলে দাবি করেন তিনি।
সাগর জানান, তার বড় ভাই নিহত শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স করেছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে বাসে যাতায়াতের সময় ‘অজ্ঞান পার্টির’ লোকজন তাকে কিছু একটা খাইয়ে দিলে পরিবারের সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। চিকিৎসা নেওয়ার পর শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মাঝেমধ্যে ‘মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত’ আচরণ করতেন শামীম। এ কারণে তার প্রথম সংসার ভেঙে যায়। সেই ঘরে তার আট বছরের একটি ছেলে আছে। পরে দ্বিতীয় বিয়ে করেন শামীম। সেই সংসারে সাগরের সাত মাসের আরেকটি ছেলে রয়েছে।
শামীমের পরিবারকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানায়, মবের ঘটনার সূত্রপাত হয় সোমবার। সেদিন স্ত্রীর সঙ্গে শামীমের পারিবারিক কলহ হয়। পাড়া-প্রতিবেশীদের কেউ কেউ শামীমকে উসকে দেয় এবং (ঝগড়ার সময়) শামীমের বলা কথা রেকর্ড করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
সামাজিক মাধ্যমে অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়লে দলবদ্ধ লোকজন শামীমদের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর চালায়। ওই ঘটনায় স্থানীয় জামায়াতের একদল নেতাকর্মীরও সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানান ছোট ভাই সাগর। তিনি বলেন, ‘বাসায় যেদিন প্রথম হামলা হয়, সেদিন যারা আসছিল তারা সবাই জামায়াতে ইসলামের সমর্থক এবং কর্মী। মাঠ পর্যায়ের যারা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ— সভাপতি, সেক্রেটারি, এককথায় ওনাদের কমিটিতে যারা আছে। এরা যখন প্রথম হামলা করে, আমাদের বাজারে জামায়াতের যে অফিস আছে, ওখানে সংগঠিত হয়ে ওখান থেকে এসেই প্রথম হামলা করা হয়।’
অস্বীকার স্থানীয় জামায়াতের : তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দেবহাটার দুই নং পারুলিয়া ইউনিয়নের আট নং ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল ইসলাম গাজী। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ডাক্তারের চেম্বারের পাশে সাধারণ মানুষ তারে মারধর করে। এই পর্যন্ত জানি আমরা।’ জামায়াতের কেউ ছিল কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘না... এলাকার সবাই ছিল।’
এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর তিনটা পর্যন্ত কোনো মামলা করা হয়নি। তবে আজকের মধ্যেই পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করা হবে বলে জানিয়েছেন নিহত শামীমের ছোটো ভাই সাগর।
গ্রেপ্তার হননি মবের ডাক দেওয়া ব্যক্তি : বিবিসির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মঙ্গলবার নিজ ফেসবুক পেজ থেকে লাইভ করেন মো. ফজলুল হক আমিনী। স্থানীয়ভাবে নিজেকে মুফতি পরিচয় দেওয়া ওই লোক দুপুর সাড়ে তিনটা থেকে একের পর এক উসকানিমূলক ভিডিও প্রকাশ করেন। সেসব ভিডিওতে কখনও তাকে জনসাধারণকে ডাক দিতে শোনা যায় তো কখনও একদল মানুষকে নিয়ে মিছিল করতে দেখা যায়। এমনকি বুধবার রাত ১২টার দিকে মৃত শামীমের ছবি প্রকাশ করে উল্লাসও প্রকাশ করেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার সকালে ইমোতে ছড়িয়ে পড়া অডিওটি ফেসবুক উপযোগী করে ছাড়ার জন্য সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন আমিনী এবং দুপুরের দিকে সেই অডিও ফেসবুকে দেন। কিন্তু এতটা সময় পেরিয়ে গেলেও তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
এনিয়ে প্রশ্ন করা হলে দেবহাটা থানার ওসি এইচএম শাহীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমাদের এগুলো নজরে এসেছে। আমরা আমাদের কার্যক্রম করছি। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রকাশ্যে : সাতক্ষীরায় আমাদের সময়ের নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, ফেসবুক লাইভ ও পোস্টের মাধ্যমে উসকানি ছড়িয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটার পরও মূল প্ররোচনাকারী ফজলুল হজ আমিনী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক ও নেটিজেনরা।
পরিবারের বর্ণনা : নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল জানান, সোমবার সন্ধ্যায় স্ত্রীর সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন ধরনের গালিগালাজ করেন মানসিক রোগাক্রান্ত ওয়াহিদুজ্জামান। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি অডিও রেকর্ড সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়।
ওই অডিওতে কটূক্তি সংক্রান্ত কথা রয়েছে দাবি করে দেবহাটার ফজলুল হক আমিনী ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ফেসবুকে লাইভ করে জনতাকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর উত্তেজিত জনতা ওয়াহিদুজ্জামানের বাড়ির গেট ভাঙচুর করে সুবর্ণাবাদ বাজারে নিয়ে মারধর করে। পরে মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে এসে তিনি বিষপান করেন। রাতে তাকে দেবহাটার কুলিয়া বাজারে চিকিৎসক আব্দুস সবুরের চেম্বারে নিয়ে পাকস্থলী পরিষ্কার করার পর সুস্থ হয়ে ওঠেন।
পরদিন মঙ্গলবার ফজলুল হক আমিনীসহ বিক্ষুব্ধরা চিকিৎসাধীন শামীমকে চেম্বার থেকে বের করে গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সখীপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এরপর ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এক হাজারের বেশি লোক সখীপুর হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদুজ্জামানকে দেয়ালে আছাড় মারে এবং বাইরে এনে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে ফেলে রেখে চলে যায়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মব সৃষ্টির মাধ্যমে আইন হাতে তুলে নিয়ে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আব্দুল জলিল।
উসকানি ও স্বীকারোক্তি : এ ঘটনায় মবের ডাক দেওয়া ফজলুল হক আমিনী সাংবাদিকদের বলেন, ইসলাম ধর্ম, কোরআন বা রাসূল স.কে নিয়ে কেউ কটূক্তি বা অবমাননা করলে তা আইনের দৃষ্টিতে যেমন অপরাধ, তেমনি শরীয়তের দৃষ্টিতেও এর বিচার হওয়া উচিত। ধর্ম নিয়ে ওয়াহিদুজ্জামান দীর্ঘ ছয় মাস ধরে আপত্তিকর মন্তব্য করে আসছিল। ‘তৌহিদী জনতা’ গণপিটুনি দিয়ে তাকে পৃথিবী থেকে বিদায় করেছে।
এ ছাড়া আমিনী তার ফেসবুক লাইভে এসে মানুষ জড়ো করার বিষয়টির পাশাপাশি নিজের এই অবস্থানের কথা স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে প্রশাসন বা অন্য কেউ তাকে ধরলে তার জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছেন এবং বাজারে এসে প্রশাসনের অপেক্ষায় করছেন, এমনকি এর পরিণামে তার ফাঁসি বা জেল-জুলুম হলেও তার কোনো আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন।
এ ব্যাপারে হিউম্যান রাইটস কোয়ালিশন, সাতক্ষীরার আহ্বায়ক মাধব চন্দ্র দত্ত বলেন, একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষকে হাসপাতাল থেকে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, আর যে লোক মাইকিং বা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী মব সৃষ্টি করল, সে এখনও আইনের আওতার বাইরে থাকা মানে দেশে ‘মব কালচার’কে প্রশ্রয় দেওয়া। তিনি অবিলম্বে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
