তুমুল আলোচনায় এখন মরক্কোর হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নিলা পাউডার। উজ্জ্বল নীল রঙের এই গুঁড়া ত্বকের কালো দাগ, পিগমেন্টেশন ও রোদে পোড়া ভাব কমানোর উপায় হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউবে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ত্বকের যত্ন নিয়ে নতুন নতুন ট্রেন্ড প্রায়ই দেখা যায়। কখনও রাইস মাস্ক, কখনও আইস ফেসিয়াল নয়তো নতুন নতুন উপাদানে তৈরি ফেসপ্যাক। সেই ধারাবাহিকতায় এক আলোচনায় মরক্কোর নিলা পাউডার।

উজ্জ্বল নীল রঙের এই গুঁড়া ত্বকের কালো দাগ, পিগমেন্টেশন ও রোদে পোড়া ভাব কমানোর উপায় হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক ও ইউটিউবে। কিন্তু সত্যিই কি এই পাউডার ত্বক উজ্জ্বল করতে পারে?
কী এই নিলা পাউডার?
নিলা পাউডার নামে পরিচিত নীল রঙের গুঁড়া মরক্কো ও সাহারা অঞ্চলের সৌন্দর্যচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। মরক্কোর প্রচলিত গোসলের রীতিতে ত্বক নরম ও মসৃণ রাখার জন্য এ ধরনের উপাদান ব্যবহারের কথা জানা যায়। বলা হয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মরক্কোর হাম্মাম বা বাষ্পস্নানের সময় ত্বকের পরিচর্যায় নিলা পাউডার ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

নারীরা এই উপকরণকে কালো গুঁড়া সাবান (সাবুন বেলদি), আরগান তেল, গোলাপজল কিংবা কাদামাটির সঙ্গে মিশিয়ে ত্বক উজ্জ্বল করার জন্য বডি মাস্ক তৈরি করেন। বিয়ের আগে কনের সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবেও দীর্ঘদিন ধরে নিলা পাউডার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর উদ্দেশ্য ত্বককে নরম ও উজ্জ্বল করা।
তবে বাজারে নিলা পাউডার নামে বিক্রি হওয়া সব পণ্যের উপাদান বা উৎস এক নয়। কোনো পণ্যে নীল খনিজের গুঁড়া, কোনো পণ্যে নীল রঞ্জক কিংবা অন্য উপাদান থাকতে পারে। মরক্কোর নিলা (যা নিলা জারকা বা নিলা সাহরাউইয়া নামেও পরিচিত) উত্তর আফ্রিকার মরুভূমি ও ঐতিহ্যবাহী গোসলখানার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত গাঢ় নীল রঙের একটি গুঁড়া। আরবি ভাষায় ‘নিলা’ শব্দের অর্থ নীল। নিলা পাউডারের উৎপত্তি সাহারা মরুভূমি অঞ্চল ও দক্ষিণ মরক্কোতে। ঐতিহাসিকভাবে সাহরাউই ও তুয়ারেগ সম্প্রদায়ের নারীরা মরুভূমির শুষ্ক, তীব্র বাতাস ও প্রখর রোদ থেকে ত্বক সুরক্ষার উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করতেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

নিলা পাউডার নীল রঞ্জক উৎপাদনকারী উদ্ভিদ, যেমন ইন্ডিগোফেরা টিনক্টোরিয়া (নীলগাছ), অথবা সাহারা অঞ্চলের শিলাস্তরে পাওয়া প্রাকৃতিক খনিজের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বর্ণনা করা হয়। তবে নিলা নামে বিক্রি হওয়া সব পণ্যের প্রকৃত উৎস ও উপাদান এক নয়। তাই শুধু নীল রং বা মরক্কোর নাম দেখেই পণ্যের উপাদান ও কার্যকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।
যেভাবে ভাইরাল হলো
নিলা পাউডার জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ট্রেন্ড কাজ করছে। কনটেন্ট নির্মাতাদের অনেকে মুখের অর্ধেক অংশে নিলা পাউডার মিশ্রিত ফেসপ্যাক লাগিয়ে রাখেন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর মুখ ধুয়ে দুই পাশের ত্বকের পার্থক্য দেখান। তাঁদের দাবি, ব্যবহারের পর ত্বক আরও উজ্জ্বল ও সতেজ দেখায়।
সাধারণত এই পাউডারের সঙ্গে দই, গোলাপজল কিংবা অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করা হয়। আবার বাজারে পাওয়া কিছু বাণিজ্যিক পণ্যে নিলা পাউডারের সঙ্গে কেওলিন ক্লে, চালের গুঁড়া, নিয়াসিনামাইড বা কোজিক অ্যাসিডের মতো উপাদানও মেশানো হয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওতে দেখানো তাৎক্ষণিক পরিবর্তনকে স্থায়ী ফল হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। আলো, ক্যামেরার সেটিংস, ত্বকের আর্দ্রতা এবং পণ্যের অন্যান্য উপাদানও ত্বককে সাময়িকভাবে উজ্জ্বল দেখাতে পারে।
কালো দাগ ও ট্যান কি কমে?
নিলা পাউডার নিয়ে প্রচারিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্বকের রঙের অসমতা কমানো, কালো দাগ হালকা করা, রোদে পোড়া ভাব দূর করা এবং অতিরিক্ত তেল নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু শুধু নিলা পাউডার এসব সমস্যার সমাধান করে, এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো সীমিত।

ত্বকের কালো দাগ বা পিগমেন্টেশন কমাতে উপাদানভেদে নিয়াসিনামাইড ও কোজিক অ্যাসিডের ভূমিকা থাকতে পারে। তবে কোনো পণ্যে এসব উপাদান থাকলেই সেটি কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। উপাদানের ঘনত্ব, ফর্মুলা এবং ব্যবহারের নিয়মও গুরুত্বপূর্ণ। রোদে পোড়া ভাব ও পিগমেন্টেশন কমানোর ক্ষেত্রে নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার বিশেষভাবে জরুরি। শুধু ফেসপ্যাকের ওপর নির্ভর করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও মিলতে পারে।
ব্যবহারের আগে সতর্কতা
নিলা পাউডার ব্যবহারের আগে পণ্যের উপাদান, প্রস্তুতকারক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করুন। প্রথমবার ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নিন। জ্বালা, চুলকানি বা লালচে ভাব দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করুন। সংবেদনশীল ত্বকে অপরিচিত উপাদান ব্যবহার না করাই ভালো।

ত্বকের যত্নে ভাইরাল কোনো ট্রেন্ড অনুসরণ করার আগে মনে রাখা প্রয়োজন, সবার ত্বক এক রকম নয়। একটি পণ্য কারও ত্বকে মানালেও অন্য কারও ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। নিলা পাউডার নিয়ে আগ্রহ থাকতেই পারে, তবে ত্বক উজ্জ্বল করার প্রতিশ্রুতিতে মুগ্ধ হওয়ার আগে পণ্যের উপাদান ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ যাচাই করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: হেলথলাইন, অ্যালিউর
ছবি: ইন্সটাগ্রাম
