সরকারের ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিকল্প নেই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে শুরু করে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ সব ক্ষেত্রেই সরকারের নিজস্ব আয়ের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো নিম্ন পর্যায়ে। বিপরীতে প্রতিবছর বাড়ছে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা। এই পরিস্থিতিতে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি শনাক্তে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, বকেয়া আদায় এবং রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত পরিকল্পনায় আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও কাস্টমসসহ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে করদাতার আয় ও সম্পদের তথ্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, কর ফাঁকির ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত, অনলাইনে কর নির্ধারণ ও শুনানি, স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত এবং বকেয়া রাজস্ব আদায়ে জোরালো উদ্যোগ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট বাজেট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশই আসবে সংস্থাটির মাধ্যমে।
তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, বিপুল কর অব্যাহতি, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সীমাবদ্ধতা এবং রাজস্ব প্রশাসনের জনবল সংকট। ফলে শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করেই কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। করনীতির সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং করদাতার আস্থা অর্জনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বাজেটের বড় ভরসা এনবিআর
২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের মোট বাজেট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশই আসবে সংস্থাটির মাধ্যমে। বাজেটের এই লক্ষ্য অর্জনে আগের বছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।
এনবিআরের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, সরকারের মোট আহরিত রাজস্বের প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৮৬ টাকাই আসে সংস্থাটির মাধ্যমে। গত দুই দশকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। তবে অর্থনীতির আকার ও সরকারি ব্যয়ের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজস্ব বাড়াতে এনবিআর তিনটি কৌশল সামনে এনেছে। প্রথমটি ‘রিকভারি স্ট্র্যাটেজি’, যার লক্ষ্য রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো। দ্বিতীয়টি ‘রিস্টোরেশন স্ট্র্যাটেজি’, যার মাধ্যমে করের আওতা সম্প্রসারণ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয়টি ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন স্ট্র্যাটেজি’, যার লক্ষ্য প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বাড়ানো।
এনবিআরের পরিকল্পনায় রাজস্ব আহরণের গড় প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে করহার বাড়ানোর চেয়ে করজাল সম্প্রসারণ, বিদ্যমান করদাতাদের প্রকৃত আয় নিরূপণ এবং কর অব্যাহতির যৌক্তিকতা পর্যালোচনাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কর ফাঁকি ও আয় গোপন করার প্রবণতা ঠেকাতে ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডাটা ম্যাচিং সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে করদাতার ঘোষিত আয়, ব্যাংক আমানত, সম্পদ কেনা এবং বিদেশ ভ্রমণের মতো তথ্যের মধ্যে অসংগতি আছে কি না, তা শনাক্ত করা হবে। সমন্বিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যাক্সপেয়ার প্রোফাইল’ তৈরির মাধ্যমে করদাতার আর্থিক অবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। কাস্টমসে যুক্ত হচ্ছে এআই রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ও কিউআর কোড।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের রাজস্ব খাতের অন্যতম দুর্বলতা হলো কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকা। অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে কর আদায় বাড়ছে না। ফলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয় ও নিয়মিত প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহে ঋণের ওপর নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে।
এনবিআরের মতে, রাজস্ব আহরণে বড় বাধা হলো নগদ লেনদেন নির্ভর অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি। এই অর্থনীতির বড় অংশ করজালের বাইরে থাকায় প্রকৃত আয় ও ব্যবসার পরিমাণ নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতির কারণে সম্ভাব্য রাজস্বের বড় অংশ আদায় করা যায় না। এনবিআরের উপস্থাপনায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ কর, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্কে কর অব্যাহতির পরিমাণ জিডিপির যথাক্রমে ২ দশমিক ৩৯, ৩ দশমিক ২৬ ও শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অব্যাহতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক যৌক্তিকতা পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় সুবিধা কমানোর বিষয়টি রাজস্ব সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এছাড়া তিনটি অনুবিভাগের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা পুরোপুরি সমন্বিত না হওয়া, সরবরাহব্যবস্থার ডিজিটাল নজরদারিতে ঘাটতি এবং অসংগতিপূর্ণ আইন প্রয়োগের কারণে করদাতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
আরও পড়ুন
১৬টি উৎস থেকে করদাতা শনাক্তের পরিকল্পনা
করহার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণে ‘পোটেনশিয়াল ট্যাক্সপেয়ার আইডেন্টিফিকেশন প্রোগ্রাম’ বা সম্ভাব্য করদাতা শনাক্তকরণ কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়েছে এনবিআর। এর আওতায় ব্যাংক লেনদেন, জমি ও ফ্ল্যাট কেনা, গাড়ির মালিকানা, ক্রেডিট কার্ড, বিদেশ ভ্রমণ, সরকারি ক্রয়, শেয়ারবাজার এবং ইউটিলিটি সংযোগসহ ১৬টি ক্ষেত্রের তথ্য ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই তথ্যের সঙ্গে করদাতার আয়কর রিটার্নের তথ্য মিলিয়ে দেখা হবে। যাদের করযোগ্য আয় রয়েছে কিন্তু রিটার্ন জমা দেন না, কিংবা টিআইএন থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত কর পরিপালন করেন না, তাদের শনাক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে টিআইএন ডাটাবেজ পর্যালোচনা করে করদাতাদের নিয়মিত রিটার্নদাতা, শূন্য রিটার্নদাতা, নন-ফাইলার, নিষ্ক্রিয় এবং সম্ভাব্য করদাতা—এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর কার্যালয়গুলোর কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে নতুন সক্রিয় করদাতা যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। তবে করদাতার তথ্য বিভিন্ন সংস্থা থেকে সংগ্রহ ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা, গোপনীয়তা এবং আইনগত অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু তথ্যভাণ্ডার তৈরি করলেই হবে না, সেসব তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ কর নির্ধারণ ও আদায় নিশ্চিত করার সক্ষমতাও থাকতে হবে।
কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে অনুমোদিত পদের তুলনায় কর্মরত জনবল কম থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। যা রাজস্ব আহরণের গতি শ্লথ করে দিচ্ছে। কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে ১৪ হাজার ২৯৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৭ হাজার ৬৮২ জন এবং শূন্য পদের সংখ্যা ৫ হাজার ৭২২টি। এর মধ্যে প্রথম থেকে দশম গ্রেডে ৭ হাজার ৬৬২টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৪ হাজার ৭২ জন এবং শূন্য ২ হাজার ৭০৬টি পদ। বিপুল পদ শূন্য থাকায় এবং অনিয়ন্ত্রিত কর অব্যাহতির কারণে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন ধীরগতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
আয়-সম্পদের অসংগতি ধরতে আসছে ডেটা-ম্যাচিং
কর ফাঁকি ও আয় গোপন করার প্রবণতা ঠেকাতে ‘ন্যাশনাল ইনকাম ট্যাক্স ডাটা ম্যাচিং সিস্টেম’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে করদাতার ঘোষিত আয়, ব্যাংক আমানত, সম্পদ কেনা এবং বিদেশ ভ্রমণের মতো তথ্যের মধ্যে অসংগতি আছে কি না, তা শনাক্ত করা হবে। সমন্বিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যাক্সপেয়ার প্রোফাইল’ তৈরির মাধ্যমে করদাতার আর্থিক অবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অস্বাভাবিক অসংগতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে ঝুঁকিভিত্তিক যাচাইয়ের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। উচ্চ সম্পদসম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আলাদা প্রোফাইলিং করা হবে।
করপোরেট করের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের টার্নওভার, মোট মুনাফার অনুপাত, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে লেনদেন, রয়্যালটি এবং আমদানি মূল্যসহ ১৪টি সূচক পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানির কর ফাঁকি ও মুনাফা স্থানান্তর শনাক্তে আন্তর্জাতিক কর ও ট্রান্সফার প্রাইসিং ইউনিটের সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। উৎসে কর ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় প্ল্যাটফর্ম, করদাতার জমা ও কর্তন করা করের হিসাব সংরক্ষণে রিয়েল-টাইম ট্যাক্স ক্রেডিট লেজার এবং অতিরিক্ত কর কর্তনের অর্থ ফেরত দিতে স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড ব্যবস্থার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনলাইনে কর নির্ধারণ, শুনানি ও রিটার্ন
আয়কর বিভাগের কার্যক্রমকে ডিজিটাল, ব্যক্তি নিরপেক্ষ ও তথ্যনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে এনবিআর। এর আওতায় অনলাইনে নোটিশ পাঠানো, নথি জমা, শুনানি, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা বা কেস বরাদ্দ এবং আদেশ জারির ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। চাকরিজীবীদের জন্য প্রি-ফিল্ড বা আগে থেকে পূরণ করা আয়কর রিটার্ন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বেতনসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য আগে থেকেই যুক্ত থাকলে করদাতাকে কম তথ্য পূরণ করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সহজ রিটার্ন এবং বাড়ির মালিকদের আয় শনাক্তে সম্পত্তিভিত্তিক কর্মসূচির কথাও বলা হয়েছে।
বকেয়া কর আদায়ে ‘ইনকাম ট্যাক্স ডেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ চালুর পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে টিআইএন ডাটাবেজ পরিশোধন, নন-ফাইলার শনাক্ত এবং বকেয়া করের তালিকা তৈরির কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে নন-ফাইলারদের রিটার্ন দাখিলে উদ্বুদ্ধ করা এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসায় ভ্যাট ফাঁকি ঠেকাতে নজরদারি
ভ্যাট অনুবিভাগের পরিকল্পনায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও লেনদেনের তথ্যের সঙ্গে ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর বা বিআইএন যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক হিসাব খোলা বা পরিচালনা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল আর্থিক সেবার মার্চেন্ট হিসাব, ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্যপদ, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ এবং যানবাহন নিবন্ধনের মতো ক্ষেত্রে বিআইএন ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিধান ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কর অব্যাহতির অপব্যবহার কমাতে ‘ট্যাক্স এক্সপেন্ডিচার পলিসি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৫’ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে। কর অব্যাহতির প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট সময় শেষে সুবিধা পুনর্মূল্যায়নের বিধান বা সানসেট ক্লজ যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তামাক খাতে কর ফাঁকি ঠেকাতে পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে নজরদারি, ট্র্যাক অ্যান্ড ট্রেস ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং স্ট্যাম্পে কিউআর বা এআর কোড ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নাগরিকদের কাছ থেকে কর ফাঁকির তথ্য সংগ্রহ এবং তথ্যদাতাদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজে কর পরিশোধের ব্যবস্থা এবং বড় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিবিড় পরিবীক্ষণ জোরদার করার কথা জানিয়েছে এনবিআর। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন প্রশাসনিক চাপ তৈরি না করে কর পরিপালন সহজ করাই এ উদ্যোগের কার্যকারিতার অন্যতম শর্ত।
আরও পড়ুন
কাস্টমসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে এনবিআরের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আসে। আমদানি-রপ্তানির পণ্য চালান, ঘোষিত মূল্য, শুল্কায়ন ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে কাস্টমসের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এনবিআরের উপস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসমৃদ্ধ ‘অটোমেটেড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ বা স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উচ্চ ঝুঁকির পণ্য চালান শনাক্ত করে যাচাই কার্যক্রমে অগ্রাধিকার দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার ছাড়পত্র একটি প্ল্যাটফর্মে আনতে ‘বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো’ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার শনাক্তে কাস্টমসের ট্রান্সফার প্রাইসিং সেলের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোতে কাস্টমস অ্যাটাশে পদ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরা হয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকাতে কাঁচামালের ব্যবহার ও মজুতের হিসাব নজরদারিতে কাস্টমস বন্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা পণ্য দ্রুত নিলামে তোলার মাধ্যমে জট কমানো এবং আটকে থাকা রাজস্ব আদায়েও জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
জনবল সংকটে ধীর হতে পারে সংস্কার
প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব ব্যবস্থার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। এনবিআরের উপস্থাপনায় কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে অনুমোদিত পদের তুলনায় কর্মরত জনবল কম থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। যা রাজস্ব আহরণের গতি শ্লথ করে দিচ্ছে। কাস্টমস ও ভ্যাট অনুবিভাগে ১৪ হাজার ২৯৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৭ হাজার ৬৮২ জন এবং শূন্য পদের সংখ্যা ৫ হাজার ৭২২টি। এর মধ্যে প্রথম থেকে দশম গ্রেডে ৭ হাজার ৬৬২টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৪ হাজার ৭২ জন এবং শূন্য ২ হাজার ৭০৬টি পদ। অত্যন্ত সংবেদনশীল ষষ্ঠ গ্রেডের (উপ কমিশনার) ২৪৭টি পদের মধ্যে খালি ১৬৭টি (কর্মরত মাত্র ৮০ জন)।
নবম গ্রেডের রাজস্ব কর্মকর্তার ১ হাজার ১৪৭টি পদের মধ্যে ৩২০টি পদ শূন্য এবং দশম গ্রেডের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার ৫ হাজার ৬৩১টি পদের বিপরীতে ২ হাজার ৩৮৬টি পদই শূন্য। একাদশ থেকে ২০তম গ্রেডের ৬ হাজার ৬৩৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ৩ হাজার ৬১০ জন কর্মরত আছে। পাশাপাশি ৩ হাজার ১৬টি পদ খালি পড়ে থাকায় মাঠ পর্যায়ে আদায় মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে বলে জানানো হয়।
বিশেষ করে উপকমিশনার, রাজস্ব কর্মকর্তা ও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার মতো পদে পর্যাপ্ত জনবল না থাকলে কর নির্ধারণ, অডিট, বকেয়া আদায় এবং আমদানি-রপ্তানির পণ্য যাচাই কার্যক্রমে চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে নতুন সফটওয়্যার চালুর পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং দায়িত্ব বণ্টনের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথক করার উদ্দেশ্যে আগে জারি করা অধ্যাদেশগুলোর আইনগত অবস্থা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ যাচাই করা প্রয়োজন। এদিকে প্রশাসনিক পুনর্গঠন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সংস্কার কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। এই সংস্কারের লক্ষ্য, সুপারিশ এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন
করদাতা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়
কর বিশ্লেষক স্নেহাশীষ বড়ুয়া মনে করেন, রাজস্ব আদায় বাড়াতে শুধু করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। যাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা বেশি, তাদের প্রকৃত আয় ও সম্পদ নিরূপণ করে প্রাপ্য কর আদায় নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক করদাতা তাদের প্রকৃত আয় আয়কর রিটার্নে দেখান না। এতে সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এই সমস্যা মোকাবিলায় ব্যাংক, রাজউক, ভূমি অফিসসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে আয় ও সম্পদের তথ্য যাচাই এবং কর ফাঁকি শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
কর অব্যাহতি কমিয়ে রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কারের তাগিদ ড. জাহিদের
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা কম কর আদায় এবং ব্যাপক কর অব্যাহতি। একদিকে সরকার রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে কর অব্যাহতির কারণে সম্ভাব্য রাজস্বের বড় অংশ আদায় হচ্ছে না।
তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমানোর পাশাপাশি কার্যকর করনীতি প্রণয়ন এবং এনবিআরের প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে ভ্যাটের হার ও কাঠামো পর্যালোচনা এবং পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বছরের পর বছর ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়নের ফলে সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। করের আওতা সম্প্রসারণ, বিদ্যমান ব্যবস্থার পূর্ণ ব্যবহার এবং কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এসআর/এমএন
