রূপালী আলোয় যখন বিজয়া দশমীর সকাল নেমে এলো, তখন ঢাকের বোলেও বদলে গেল সুর। আনন্দের জায়গায় বাজে বিদায়ের ধ্বনি। ম-পে ম-পে দেবীর পাদপদ্মে মাথা ঠেকিয়ে, সিঁদুর ছুঁইয়ে আর চোখের জলে ‘পিতৃগৃহ’ থেকে ‘কৈলাসে’ বিদায় জানানো হয় দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে। রাজধানীর রাজপথ থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকার ম-প কিংবা ঐতিহাসিক মন্দির প্রাঙ্গণে এদিন সকাল থেকেই সনাতন ধর্মী মানুষের হৃদয়জুড়ে ছিলো ভক্তি আর বিদায়-বেদনার এক অনন্য মিশ্রণ।
বনানীর কামাল আতাতুর্ক পার্কের গুলশান-বনানী পূজা ম-পে সকাল থেকেই ছিল উপচেপড়া ভিড়। ম-পের প্রধান পুরোহিত সুনীল চক্রবর্তী সকাল ৮টা ৫ মিনিটে দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। ধর্মীয় আচার, শ্যামা পূজা ও অপরাজিতা পূজা শেষে ভক্তরা অঝোর ভক্তিতে নিবেদন করেন শেষ পুষ্পাঞ্জলি। দর্পণ বিসর্জনের পরপরই শুরু হয় বিজয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আবেগঘন পর্ব ‘সিঁদুর খেলা’। দেবীর মুখে মিষ্টি ছুঁইয়ে, চরণে সিঁদুর পরিয়ে স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সংসারের মঙ্গল কামনা করেন তারা।
এরপরই শুরু হয় একে অপরকে সিঁদুরে রাঙিয়ে দেয়ার উৎসব। বনানী ম-পে আসা ভক্ত সুচরিতা চৌধুরী কপালে ও গালে সিঁদুর মেখে আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘বিজয়ার এই সিঁদুর খেলা কেবল প্রথা নয়, আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও ভালোবাসার বন্ধনকে আরও শক্ত করে তোলার মাধ্যম।’ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রমনা কালী মন্দির প্রাঙ্গণ পরিণত হয় হাজারো ভক্তের মিলনমেলায়। একদিকে বিদায়ী আরতি ও শেষ অঞ্জলি, অন্যদিকে বিশাল ম-পের মাঠে ঢাকের তালে নাচে-গানে মেতে ওঠেন তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে শিশু-বৃদ্ধ সবাই। স্ত্রীদের পাশাপাশি স্বামীরাও স্ত্রীর কপালে সিঁদুর দিয়ে সংসারের কল্যাণ প্রার্থনা করেন।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সকাল ৯টা ৫৭ মিনিটে দর্পণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শাস্ত্রীয় পূজার সমাপ্তি ঘটে। বেলা ১১টায় শুরু হয় দেবী বরণ এবং দুপুর ১২টায় লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীরা মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়। উৎসবের এই ক্ষণে ভক্তদের হৃদয়ে যেন ক্ষণে ক্ষণে বেজে উঠছিল বিরহের সুর। বনানী ম-পের রিম্পা সেন যেমনটা বলছিলেন, ‘সারাটা বছর ধরে এই কয়টা দিনের জন্য অপেক্ষায় থাকি। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতেই শুরু হয় বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়। ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়, সমবয়সীরা কোলাকুলি করে এবং মিষ্টিমুখে একে অপরকে জানায় ‘শুভ বিজয়া’র প্রীতি ও শুভেচ্ছা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নির্দেশনা মেনে সন্ধ্যার আগেই প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নেয়া হয়। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সহসভাপতি তাপস কুমার পাল জানান, বৈকালিক চারটার দিকে ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে বের হবে কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা। পলাশী, জগন্নাথ হল, দোয়েল চত্বর, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড ও রায়সাহেব বাজার হয়ে শোভাযাত্রাটি পৌঁছাবে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে; যেখানে শান্তিজলে বিসর্জন দেয়া হবে দেবীকে। মহালয়ার দিন মর্ত্যে ‘কন্যারূপে’ পদার্পণ করা দশভূজা দেবী দুর্গা আবার ফিরে যাচ্ছেন স্বামী শিবের গৃহ কৈলাসে। এক বছরের জন্য বিদায় নিলেও ভক্তদের মনে রেখে যাচ্ছেন শান্তির বার্তা আর আগামী শরতে আবার ফিরে আসার অটুট প্রতিশ্রুতি।
