চোরবাগান কাণ্ডের তদন্তে এবার আরও এক ধাপ। সপ্তমীর সন্ধেয় চোরবাগানের মণ্ডপে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সময় ঘোষণা দায়িত্বে থাকা সেন্টু ও কালিয়ার কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করতে চেয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ তদন্তকারীরা। আদালতের পুলিশের দাবি, দুর্ঘটনার আগে মাইকে যে ঘোষণা হয়েছিল, তার ভয়েসের সঙ্গে ধৃতদের গলা মিলছে কি না, তা নিশ্চিত করতে এই পদক্ষেপ। সূত্রের খবর, ঘটনার মুহূর্তের সিসি ফুটেজ ও ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখার কাজ চলছে। ইতিমধ্যেই এমন বেশকিছু ভিডিও ফুটেজ শনাক্ত করেছেন তদন্তকারীরা, যেখানে নির্দেশমূলক মাইকিং স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সেই অডিওগুলিও পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আদালতের অনুমতি নিয়ে ধৃত সেন্টু ও কালিয়ার কণ্ঠস্বরের নমুনা সংগ্রহ করা ও তা সংগৃহীত ভিডিওর সঙ্গে ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মিলিয়ে দেখা হবে।
চোরবাগান কাণ্ডের তদন্তে নেমে পুলিশের হাতে উঠে এসেছে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গিয়েছে, মণ্ডপ থেকে বাইরে বের হওয়ার পথে বেশ কয়েকটি স্টল বসানো হয়েছিল। তার কোনও অনুমতি ছিল না বলেই জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে স্টল বসানোর অনুমতি কারা দিয়েছিল তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে। ঘটনার প্রবেশ করার পথ অনেকটাই ফাঁকা ছিল। তবে চোরবাগান সর্বজনীনে যে থিম করা হয়েছিল তাতে বাইরের শব্দ ভিতরে আসা সম্ভব নয়। যে ঘোষণাকে ভুয়ো বা ভুল বলে মনে করা হচ্ছে তা বাইরে থাকা দর্শনার্থীদের জন্যই। তা হলে মন্ডপ ভেঙে যাওয়ার ঘোষণা কেন করা হল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যে সময়ে ঘোষণা করা হয়েছে তার সঙ্গে সিসি ক্যামেরার সময় মিলিয়ে দেখেই সিদ্ধান্তে আসতে চাইছেন তদন্তকারীরা। এ ছাড়াও, ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী ছিল না— এমন অভিযোগ নস্যাৎ করছে লালবাজার। যে সময় ঘটনাটি ঘটে সেই সময় পুলিশ, হোমগার্ড এবং পুজো ভলান্টিয়ার নিয়ে প্রায় ১৫০ জন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ছিল বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থার কর্মীরাও। পুলিশের তার মধ্যে ৫০ জন অস্থায়ী হোমগার্ড ছিল। এক ইন্সপেক্টর দায়িত্বে ছিল। ভিড়ের বহর বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি বুঝে দেখে দু’জন আইপিএস পদমর্যাদার ডেপুটি কমিশনারকে সেখানে আনা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, কয়েক জন হোমগার্ড দড়ি দিয়ে গার্ডরেল করছিল। তা ভিড়ের চাপে ফেলে দেয়। হোমগার্ডদের ভূমিকা কী ছিল তা-ও তদন্তের আয়তায় আনা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁদের বেশি ভাগই তৃণমূল আমলে কাজ পেয়েছে বলেও অভিযোগ করেছিলেন। তবে পুলিশের বক্তব্য, তাঁরা এখনও পর্যন্ত যত সিসি ক্যামেরা ফুটেজ দেখেছেন তাতে কোনও পুলিশকর্মী দড়ি ছেড়ে দেওয়ার প্রমাণ তাঁরা পাননি। এমনকী, নিরাপত্তার স্বার্থে ভিতরে থাকা পুলিশকর্মীরা দর্শনার্থীদের বাইরে বের হওয়ার পথের দিকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেও দেখা গিয়েছে। তবে তদন্ত একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে এক পুলিশকর্তা জানিয়েছেন। পুলিশ সূত্রের খবর, ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৬০-৭০ জনের বয়ান নেওয়া হয়েছে। জখম হওয়া ব্যক্তিদের বয়ান নেওয়া হয়েছে। ঘটনার মূহুর্তে কী ঘটেছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই দুই ‘ভুয়ো ঘোষণাকারী’-কে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতের নাম সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। তিনি কমিটির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। তাঁকে আগামী ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপর ঘোষণাকারী— কুশল মজুমদার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, পুজোর আগে যে কমিটির তরফ থেকে আবেদন করা হয়। সেখানে কী বন্দোবস্ত করা হয়েছে তা লিখিত আকারে কলকাতা পুলিশকে জানাতে হয়। পোর্টালে তা আপলোড হয়। তার পরেই অনুমতি মেলে। সেই আবেদনপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখে পুলিশ। এ ক্ষেত্রে যে বন্দোবস্ত রাখা হয়েছিল তা থেকে কতটা সরে গিয়েছে পুজো কমিটি তা জানার চেষ্টা করেছেন কলকাতা পুলিশের সিট। লালবাজারের এক কর্তার জানান, তা জানতে অনুমতিপত্রটা চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে।
