কালবেলা · আন্তর্জাতিক
অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক হল্যান্ড পার্ক মসজিদ পরিদর্শনে আন্তর্জাতিক আলেমরা
২৩/১০/২০২৬

অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল ইমামস অ্যান্ড স্কলার্স কাউন্সিলের (জিআইএসসি) চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলন ও অবকাশকালীন কর্মসূচির অংশ হিসেবে কুইন্সল্যান্ডের ব্রিসবেনে ঐতিহাসিক হল্যান্ড পার্ক মসজিদ পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। এ সময় তারা অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামের ইতিহাস, প্রাথমিক মুসলিম অভিবাসীদের অবদান এবং দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিকাশ সম্পর্কে জানার সুযোগ পান।
১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হল্যান্ড পার্ক মসজিদ অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। আফগান ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিমদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই মসজিদ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ধর্মীয় উপাসনা, ইসলামী শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে। অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের ইতিহাসেও মসজিদটির গুরুত্ব রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইমামস কাউন্সিলের (এএনআইসি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত জিআইএসসির চতুর্থ বার্ষিক সম্মেলনে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনে আন্তর্জাতিক আলেমদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, মুসলিম সমাজের সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে ইসলামী পরিচয় ও মূল্যবোধ সংরক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষ মোকাবিলা, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, ইসলামী শিক্ষার প্রসার এবং ইমাম ও আলেমদের নেতৃত্বের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
সিডনিতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা ও সাংগঠনিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রতিনিধিরা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ১১ অক্টোবর ব্রিসবেনের স্ল্যাকস ক্রিক মসজিদে অনুষ্ঠিত এএনআইসির ১৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায়ও জিআইএসসির আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
হল্যান্ড পার্ক মসজিদের ইতিহাস উনিশ শতকের শেষভাগের মুসলিম অভিবাসীদের বসতি স্থাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৮৮০-এর দশকের শেষদিকে আফগান ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিমরা ব্রিসবেনের মাউন্ট গ্রাভাট ও হল্যান্ড পার্ক এলাকায় বসতি গড়ে তোলেন। তারা প্রাথমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়মিত নামাজ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন। পরে স্থানীয় মুসলিমদের অর্থায়নে ১৯০৮ সালে সেখানে কাঠের মসজিদ নির্মিত হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মসজিদটি মুসলিম ব্যবসায়ী, শ্রমিক, ভ্রমণকারী ও স্থানীয় পরিবারগুলোর ধর্মীয় ও সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দূরদূরান্ত থেকে মুসলিম পরিবারগুলো সেখানে সমবেত হতো।
সময়ের সঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরোনো কাঠের স্থাপনাটি বৃহত্তর সম্প্রদায়ের চাহিদা পূরণে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে ১৯৬৬ সালে সেখানে নতুন দ্বিতল ইটের মসজিদ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে মসজিদটি উপাসনার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষা, সামাজিক কার্যক্রম ও পারস্পরিক সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
হল্যান্ড পার্ক মসজিদ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে জিআইএসসির প্রতিনিধিরা অস্ট্রেলিয়ায় মুসলিমদের দীর্ঘ পথচলা, তাঁদের ত্যাগ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ইতিহাস সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানার সুযোগ পান। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও প্রাথমিক মুসলিম অভিবাসীদের ধর্মীয় অনুশীলন অব্যাহত রাখা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা এই ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য দিক।
বর্তমানে হল্যান্ড পার্ক মসজিদ ধর্মীয় উপাসনা, ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও সামাজিক যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে। মসজিদ-সংশ্লিষ্ট একটি জাদুঘর কুইন্সল্যান্ডে মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস সংরক্ষণেও অবদান রাখছে।
সফরকালে জিআইএসসি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি আন্তরিক অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
ঐতিহাসিক এই পরিদর্শন অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামের শিকড় ও মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদানকে তুলে ধরার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আলেমদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗