সংবাদ · সাধারণ
তিস্তাচরের ঘাসে লুকিয়ে অ্যানথ্রাক্স, শঙ্কায় খামারিরা
২৪/১০/২০২৬

তিস্তার যে চরে দুই মাস আগেও ছিল থৈথৈ পানি, এখন সেই চর পরিণত হয়েছে গো-চারণভূমিতে। চরাঞ্চলের খামারি ও গরু মালিকরা হাজারও গরু-ছাগলের পাল নিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অবস্থান করছেন তিস্তার চরে। গবেষকদের মতে, তিস্তার চরের এই গো-চারণভূমি থেকে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষকদের মতে, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া পশু নদীতে ভেসে আসার কারণে চরাঞ্চলের ঘাসের মধ্যে জীবাণু থাকার আশঙ্কা অনেক বেশি। সে কারণে নদীবেষ্টিত এলাকা থেকে অ্যানথ্রাক্স ছড়ায় বেশি।গত বছর থেকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ব্যাপকহারে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে গবেষকরা তিস্তা নদীর চরাঞ্চলের গো-চারণভূমিতে গরু-ছাগল চড়ানো ও চরের ঘাস গরু-ছাগলকে খাওয়ানোর বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন।উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চন্ডিপুর, কঞ্চিবাড়ি, শান্তিরাম, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে তিস্তা নদী প্রবাহিত। সবচেয়ে বেশি গরু-ছাগল লালন-পালন হয় তিস্তার চরাঞ্চলে। চরের গরু-ছাগল উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার হাট-বাজারে বিক্রি হয়।উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে উপজেলার বেলকা ইউনিয়নে প্রথম অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়। ওই সময় অ্যানথ্রাক্সে অন্তত ১০টি গরু-ছাগল মারা যায়।সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৩৫ জন মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হন এবং একজন নারী মারা যান। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নে প্রথম অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরু জবাই করে ৬ জন আক্রান্ত হন।এরপর সর্বান, তারাপুর ও বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত গরু জবাই করে সরকারি হিসেবে ৪৯ জন আক্রান্ত হন। এখনো অনেকে পুরোপুরি সুস্থ হননি, কাটেনি আতঙ্ক। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন আইইডিসিআর এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের টিম।আইইডিসিআরের মেডিকেল এনটমোলজিস্ট ড. দৌলত খান বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্স জীবাণু অত্যন্ত শক্তিশালী। এই জীবাণু প্রায় ১০০ বছর মাটির মধ্যে জীবিত থাকে। অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশু মৃত্যুর পর অন্তত ৬ ফুট মাটির নিচে পুঁতে রাখতে হয়। সেটি আসলে করা হয়।’ড. দৌলত খান আরও বলেন, ‘অনেকে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত হয়ে মৃত গরু নদীতে ভেসে দেয়। সে কারণে নদীর চর এলাকায় মাটিতে অ্যানথ্রাক্স জীবাণু মিশে থাকে। ঘাসের মাধ্যমে আবার গরু-ছাগলের শরীরে প্রবেশ করে। সুন্দরগঞ্জ যেহেতু নদীবেষ্টিত এলাকা, সে কারণে চরের গো-চারণভূমিতে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর শঙ্কা রয়েছে।’ তিনি জানান, চরের প্রতিটি পরিবারই গরু-ছাগল পালন করেন।প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের ডেপুটি চিফ এপিডেমিওলজিস্ট ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ধ্বংস করা খুবই কঠিন। তবে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে পশুর খাদ্যের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রতিবছর টিকা নিতে হবে।’ ডা. রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, ‘সুন্দরগঞ্জে বারবার অ্যানথ্রাক্স আক্রান্তের মূল কারণ নদীবেষ্টিত এলাকা হওয়ায়। যেহেতু নদীর চর এলাকায় গরু-ছাগলের সংখ্যা বেশি, সেজন্য টিকাদান কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে এবং চরের ঘাস খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে।’তিস্তা নদীবেষ্টিত হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘তিস্তা চরের প্রতিটি বাড়িতে মিনি গরুর খামার রয়েছে। চরের মানুষের মূল সম্পদ গরু-ছাগল পালন। বছরের প্রায় ছয় মাস চরের ঘাস গরু-ছাগলের প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গত দুই বছরের অ্যানথ্রাক্সে চরবাসীর অনেক ক্ষতি হয়েছে।’ তিনি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম জানান, ‘ইতোমধ্যে উপজেলায় ৪৫ হাজার অ্যানথ্রাক্স টিকা প্রদান করা হয়েছে এবং কার্যক্রম এখনো চলমান। গবেষণামতে, আক্রান্ত স্থানের আশপাশ তিন কিলোমিটার এলাকার গরু-ছাগলকে টিকা দিতে হয়, সে মোতাবেক টিকা প্রদান চলছে। যেহেতু এখন চরাঞ্চলে গরু-ছাগল চড়ানো হচ্ছে, সেহেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে টিকার ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত আক্রান্তের সংখ্যা নেই বললেই চলে।’
মূল প্রতিবেদনে যান ↗