ভারতের উত্তর প্রদেশের বিজনরে মাইকে আজান দেওয়ার অভিযোগে মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ ফাইজানকে গ্রেপ্তার এবং মসজিদের মাইক জব্দ করার ঘটনা দেশটির ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘু অধিকার ও আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রশাসনের দাবি, নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রম করে লাউডস্পিকারে আজান দেওয়ায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে একজন বিট কনস্টেবলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং জেলার সব থানাকে ধর্মীয় উপাসনালয়ের মাইক ব্যবহারের বিষয়ে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে ধর্মীয় উপাসনা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকারের প্রতি যথাযথ সংবেদনশীলতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না।
বিজনরের ঘটনাটি তাই কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। নির্ধারিত শব্দসীমা অতিক্রমের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রথমেই কি শব্দের মাত্রা পরিমাপ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছিল? মুয়াজ্জিনকে গ্রেপ্তার করা এবং মাইক জব্দ করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পরিস্থিতি সংশোধনের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও স্বচ্ছ তথ্য প্রয়োজন। শব্দসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু অভিযোগের প্রকৃতি, সম্ভাব্য ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়াই ন্যায়বিচারের মৌলিক শর্ত। প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই নীতির ব্যত্যয় ঘটলে আইন প্রয়োগের উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
আজান ইসলামের একটি মৌলিক ধর্মীয় অনুশীলন। মুসলমানদের কাছে এটি কেবল একটি ঘোষণা নয়; নামাজের আহ্বান এবং ধর্মীয় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মসজিদে মাইকের মাধ্যমে আজান দেওয়া দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি। তবে এ ধর্মীয় তাৎপর্যের অর্থ এ নয় যে, মাইকের শব্দের মাত্রা বা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে না। বরং ধর্মীয় অনুশীলন ও জনস্বার্থের মধ্যে যুক্তিসংগত সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সে সমন্বয় যদি এমনভাবে করা হয়, যাতে ধর্মীয় অনুশীলনকে অযথা অপরাধের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে তা সামাজিক সম্প্রীতি ও নাগরিক অধিকারের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।
ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম অবাধে পালন, চর্চা ও প্রচারের অধিকার স্বীকার করে, যা জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা, স্বাস্থ্য এবং সংবিধানের অন্যান্য বিধানের অধীন। অর্থাৎ ধর্মীয় স্বাধীনতা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার হলেও তা সীমাহীন নয়। একই সঙ্গে এই সীমাবদ্ধতাকে ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করার অজুহাত হিসেবেও ব্যবহার করা যায় না। রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, তার পদক্ষেপ আইনসম্মত, প্রয়োজনীয় এবং যুক্তিসংগত। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া এবং কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনাপদ্ধতিকে অযথা বাধাগ্রস্ত করা এক বিষয় নয়। এ পার্থক্যটি উপেক্ষা করলে আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সেপ্টেম্বর মাসে জেলার ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো থেকে মোট ২ হাজার ৫০৯টি মাইক সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর মধ্যে মসজিদ থেকে ১ হাজার ৩২৩টি, মন্দির থেকে ১ হাজার ১১৬টি এবং গুরুদুয়ারা থেকে ৭০টি মাইক সরানো হয়েছে। এ পরিসংখ্যান একদিকে প্রশাসনের অভিযানের ব্যাপকতা নির্দেশ করে, অন্যদিকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রয়োগের প্রকৃতি ও ফলাফল যাচাই করার প্রয়োজনও তুলে ধরে। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাইক সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা থেকে এককভাবে বৈষম্যের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তবে সংখ্যাগুলো যথাযথ প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা জরুরি। কোন প্রতিষ্ঠানগুলোতে শব্দসীমা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, কোথায় অনুমতির ঘাটতি ছিল, কতটি ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল এবং কতটি ক্ষেত্রে সরাসরি মাইক জব্দ করা হয়েছে, এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রশাসনিক পদক্ষেপের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে জনসাধারণের আস্থা বাড়বে।
আইনের নিরপেক্ষতা যাচাইয়ের প্রধান মানদ- হলো, একই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না। মসজিদ, মন্দির, গুরুদুয়ারা কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শব্দদূষণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে প্রশাসনের একই মানদ-ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। একইভাবে রাজনৈতিক সভা, নির্বাচনী প্রচারণা, উৎসব, মেলা, বাণিজ্যিক প্রচার এবং অন্যান্য জনসমাগমেও শব্দসীমা কার্যকর থাকতে হবে। যদি কেবলমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে প্রশাসন কঠোর হয়, অথচ অন্য ক্ষেত্রগুলোতে একই মাত্রার লঙ্ঘন উপেক্ষা করে, তাহলে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর সে ধারণা বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রতিষ্ঠিত হলে তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি নাগরিকদের আস্থা দুর্বল করে। ভারতে এখন ঠিক তাই ঘটে চলেছে।
