যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ‘সব বোমার জননী’র জবাবে নতুন একটি বিধ্বংসী অস্ত্র উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান। একই সময়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে অন্তত সাতটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলার হুঁশিয়ারি ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তেহরানের দাবি, তাদের সামরিক সক্ষমতা আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
নতুন অস্ত্রের ঘোষণা ইরানের : ইরানের ইসলামি বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বুধবার জানান, দেশটি নতুন একটি শক্তিশালী অস্ত্র উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অস্ত্রটিকে ‘সব বোমার জনক’ নামে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে এর প্রকৃত ধরন, ওজন, পাল্লা কিংবা ধ্বংসক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি। ইরানের ইয়ং জার্নালিস্টস ক্লাবের মাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মোহেবি বলেন, নতুন অস্ত্রটি শত্রুপক্ষের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। তবে অস্ত্রটির কার্যকারিতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জিবিইউ-৪৩/বি বোমাটি ‘সব বোমার জননী’ নামে পরিচিত। এর ওজন প্রায় ৯ হাজার ৮০০ কেজি। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের একটি সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে প্রথমবারের মতো বোমাটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়ার দাবি : ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর মুখপাত্র দাবি করেছেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর দেশটির ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ বেড়েছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতাও উন্নত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের বক্তব্য, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করে এমন সক্ষমতা গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে প্রতিপক্ষ দেশটি আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করতে বাধ্য হয়।মোহেবি আরও জানান, ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগে আক্রান্ত হলে পাল্টা জবাব দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও এখন থেকে হামলার জবাবে পাল্টা আক্রমণ চালানোর বিষয়টিও সামরিক কৌশলের অংশ হবে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের তুলনায় ভিন্ন ধরনের যুদ্ধকৌশল প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হরমুজে সাত তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত: এদিকে হরমুজ প্রণালিতে রাতভর হামলা অথবা নৌমাইনের আঘাতে অন্তত সাতটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। বৃহস্পতিবার ইরানি কর্তৃপক্ষের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর নৌবাহিনীর সূত্র উল্লেখ করে এসব ঘটনার খবর জানিয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর নাম, হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান কিংবা হতাহতের সংখ্যা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ব্রিটিশ সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে এসব হামলার সত্যতা নিশ্চিত করেনি। ফলে জাহাজগুলো ঠিক কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ইরান দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে। বর্তমান উত্তেজনার মধ্যে এই জলপথ দেশটির জন্য সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি : ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে সামরিক সহায়তা অব্যাহত রাখে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আবারও হামলা চালানো হতে পারে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আলেক্সান্দ্রু হুদিস্তেনুর মতে, দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে।
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা : ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং আলোচনা শুরুর খবর পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে মতবিরোধ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। হুদিস্তেনুর মতে, দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক বিষয়গুলোতেই মতপার্থক্য থাকায় আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন কঠিন হয়ে উঠেছে। পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকি এই অচলাবস্থা আরও গভীর করতে পারে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি : পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আন্তর্জাতিক সরবরাহের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
সব মিলিয়ে, ইরানের নতুন অস্ত্র উন্মোচনের ঘোষণা, ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি, হরমুজে জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলার হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতি না হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও বাণিজ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
