বাংলাদেশে বহু বছর ধরে শিক্ষা বিস্তারের নামে শিক্ষা নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ব্যবসা চলছে। এসবের মধ্যে রয়েছে, যেখানে সেখানে কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এমনকি বেসরকারি পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন কার্যক্রম।
এগুলোর অধিকাংশই ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়ে থাকে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর বাইরে প্রাথমিক থেকে শুরু করে শিক্ষার প্রায় সব স্তরেই কোচিংব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণহীন বিস্তার তো রয়েছেই। দেশের প্রায় সব শহরের অলিগলিতে নানা ধরনের কোচিং সেন্টার গড়ে উঠছে। এখন গ্রামীণ পর্যায়ের স্থানীয় হাটবাজার এলাকায় এবং স্কুলের কাছাকাছি নতুন নতুন কোচিং সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। এর মানে হলো, শিক্ষার বাজার দিনদিন বড় হচ্ছে। অথচ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিস্তারের পাশাপাশি শিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ে না বললেই চলে। ফলে শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এখানে বলা প্রয়োজন যে, বিশ্বের প্রায় কোনো দেশের পক্ষেই তার নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিক্ষার পুরো ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় না। উন্নত দেশগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা বিকাশের ধারা পর্যবেক্ষণ করলে এটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেসব দেশে এমন কিছু বেসরকারি বা প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেগুলো বিশ্বসেরা। ওইসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক, গবেষক, বিজ্ঞানী নোবেল প্রাইজও পেয়ে থাকেন। এ থেকে বোঝা যায়, শুধু বেসরকারি বা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান হলেই যে শিক্ষার মান খারাপ হবে, তা ঠিক নয়। বাংলাদেশেও স্কুলপর্যায় থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এমন বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো অনেক উন্নতমানের। তাদের পড়ালেখার গুণগত মানও প্রশংসনীয়। তবে বহু প্রতিষ্ঠানের পড়ালেখার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে তার সব নাগরিকের জন্য সরকারি প্রচেষ্টায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। ঠিক এ কারণেই আমাদের দেশেও ব্যক্তিগত বা বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে গুরুত্বের সঙ্গে।
কোনো এলাকায় নতুন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানেই সেখানে শিক্ষার গুণগত মান বেড়ে গেল, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ভবন, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, শিক্ষা উপকরণ, সবকিছুর ব্যবস্থা করা সম্ভব। কিন্তু এসবের সমন্বয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকৃত শিক্ষা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেটিই মূল বিষয়। একই সঙ্গে বলা দরকার, দেশে নানা ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার বিস্তার ঘটছে, এটা ঠিক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, শিক্ষার মান কি বাড়ছে? এই প্রশ্নটিই এখন গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় এসেছে।
আজ আমরা শিক্ষার প্রসারকে অনেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে বিচার করি। দেশে কতটি স্কুল, কতটি কলেজ, কতটি মাদরাসা, কতটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে এসব সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, এটা ঠিক। কিন্তু শিক্ষার সাফল্য শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার শিক্ষার্থীদের কতটা শেখাতে পারছে, তাদের কী চিন্তা করতে শেখাচ্ছে, সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কী দক্ষতা তৈরি করছে, তাদের ভেতরে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ কতটা গড়ে উঠছে এবং বাস্তব জীবনের জন্য তাদের কতটা প্রস্তুত করছে, এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াচ্ছি, নাকি শিক্ষাদানের সক্ষমতা বাড়াচ্ছি?
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। শিক্ষাক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোগকে এক কথায় নেতিবাচক হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। একটি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর শিক্ষার চাহিদা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। অনেক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন দেখা যায়, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অর্জনের চেয়ে শিক্ষার বাজার বৃদ্ধি, আয় বাড়ানো ও মুনাফাপ্রাপ্তি, এককথায় শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়। আর এসব দিক যখন বেশি প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষা ধীরে ধীরে একটি পণ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এভাবেই শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
শিক্ষা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত, এটা নতুন করে বলার কিছু নেই। একই সঙ্গে এটি একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বও বটে। শিক্ষায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থাকবে, এটা স্বাভাবিক; কিন্তু অর্থনৈতিক স্বার্থ যেন শিক্ষার উদ্দেশ্যকে নিয়ন্ত্রণ না করে, এটি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় নিয়ে আসা দরকার। যতই দিন যাচ্ছে প্রতিটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনে পারিবারিক ব্যয়ের পরিমাণ কোথাও কোথাও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ব্যয়ের বাইরে রয়েছে কোচিংব্যয়, প্রাইভেট শিক্ষকের পেছনে ব্যয়, বই, গাইড, নোট ক্রয়ের ব্যয়, পরীক্ষা প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত শিক্ষা সামগ্রীর ব্যয়। ফলে একটি পরিবারের কাছে সন্তানের শিক্ষার ব্যয় অনেক সময় একটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের সৃষ্টি করে। তবে সন্তানের পেছনে শিক্ষার খরচ হিসেবে অভিভাবকরা যে অর্থ ব্যয় করেন, তা কখন ওঠে আসবে কিংবা আদৌ ওঠে আসবে কিনা, তাও নিশ্চিত নয়। তাই সন্তানের শিক্ষা অর্জনের পেছনে মাত্রারিক্ত ব্যয় মেটাতে গিয়ে বহু অভিভাবকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে, এ দিকটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ভাবতে হবে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা শিক্ষার্থীদের কি শেখাচ্ছি, নাকি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছি? বলার অপেক্ষা রাখে না, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভালো ফলাফলই শিক্ষার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাত্র। যদি একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফল করেন, কিন্তু কোনো বিষয়ে নিজের চিন্তাপ্রসূত কোনো মতামত প্রকাশ করতে পারে্ন না, যুক্তি দিয়ে কোনো বিষয়বস্তু বা ঘটনা বিশ্লেষণ করতে পারেন না, অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে্ন না কিংবা নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম না হন, তাহলে তার শিক্ষার সাফল্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণকে আরও কার্যকর করা। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার অনুমোদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে কী ধরনের শিক্ষা দিচ্ছে, শিক্ষকরা কতটা যোগ্যতা সম্পন্ন, শিক্ষার পরিবেশ কেমন, শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, প্রতিষ্ঠানটি তার নির্ধারিত শিক্ষাগত লক্ষ্য কতটা অর্জন করছে এবং শিক্ষার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মসংযোগের কতটা সম্ভাবনা রয়েছে, এসব দিক নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক শিক্ষাদান কার্যক্রমকে এমনভাবে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ছোটাছুটি করতে না হয়। পাশাপাশি পরীক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থারও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বিষয়বস্তুর মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে অনুধাবন ক্ষমতা বৃদ্ধি, ঘটনার বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা এবং এসবের বাস্তব প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। তাহলে শিক্ষাব্যবস্থাও ধীরে ধীরে পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা ও বাণিজ্যিকীকরণ থেকে বেরিয়ে আসবে বলে মনে করি।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের সাবেক অধ্যক্ষ।
The post শিক্ষার বিস্তার ঘটছে, কিন্তু অর্জন কতটা? appeared first on Dhaka Protidin.
