বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির ৬৬.১ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো (LDC) মাইক্রোসফটের মতো বহুজাতিক কোম্পানির মেধাস্বত্ব দাবি কার্যকরের ক্ষেত্রে কিছু ছাড় পেয়ে আসছে। মূলত আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের কথা ছিল, তবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দিতে পারে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে পাইরেটেড সফটওয়্যারের ব্যাপক ব্যবহার অনুমোদন করার কারণে যে শত শত কোটি ডলারের আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে, তা সংশোধনের জন্য দেশ কিছুটা সময় পাবে। তবে সমস্যাটি অধিকাংশ মানুষের ধারণার চেয়েও অনেক গভীর।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৯.২ শতাংশ পরিবারের একটি কম্পিউটার রয়েছে। বাংলাদেশের আনুমানিক ৪ কোটি ১০ লাখ পরিবারের হিসাবে এর অর্থ দাঁড়ায়, দেশে প্রায় ৩৮ লাখ পারিবারিক কম্পিউটার রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসায় ব্যবহৃত সফটওয়্যারের ৯০ শতাংশই পাইরেটেড। এই হার বিবেচনা করলে প্রায় ৩৪ লাখ কম্পিউটারে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ এবং এমএস অফিসের পাইরেটেড কপি রয়েছে, যার জন্য আইনগতভাবে মূল্য পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা পরিশোধ করা হচ্ছে না।
হিসাব করে দেখা যায়, একটি কম্পিউটারের জন্য এমএস উইন্ডোজ ১১ প্রো এবং মাইক্রোসফট অফিসের বার্ষিক খরচ প্রায় ১০,৭৫০ টাকা। সে হিসেবে শুধু ৩৪.২ লাখ পারিবারিক কম্পিউটারের জন্যই বার্ষিক আর্থিক দায় দাঁড়ায় প্রায় ৩,৬৭৬ কোটি টাকা। বাস্তবে এই হিসাব অত্যন্ত রক্ষণশীল, কারণ এতে ব্যবসায়প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার এবং অ্যাডোবি ফটোশপ বা ইলাস্ট্রেটরের মতো জনপ্রিয় সফটওয়্যারের পাইরেসি হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, পাইরেটেড মাইক্রোসফটের সফটওয়্যার লাইসেন্সিংয়ের এই বার্ষিক খরচ বোয়িং বিমান কেনার বার্ষিক ব্যয়ের কাছাকাছি। অথচ বোয়িং বিমান কেনার অর্থ পরিশোধ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও পাইরেটেড সফটওয়্যারের কারণে তৈরি হওয়া এই বিশাল আর্থিক দায় সম্পর্কে প্রায় কেউই সচেতন নন।
সৌভাগ্যবশত, পাইরেটেড সফটওয়্যারের এই বিপুল আর্থিক দায় খুব সহজেই শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য পাইরেটেড এমএস উইন্ডোজ ও এমএস অফিসের পরিবর্তে বিনামূল্যের ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার Linux Mint এবং LibreOffice, এবং অ্যাডোবির পরিবর্তে GIMP ও Inkscape ব্যবহার করা যেতে পারে। কাজী ফার্মসের মতো প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে দেড় হাজারের বেশি কম্পিউটার ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারে স্থানান্তর করে কোটি কোটি টাকা সাশ্রয় করেছে। একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর লিনাক্স বা লিবারেঅফিসে অভ্যস্ত হতে মাত্র দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে।
বাংলাদেশ সরকার সব সরকারি কম্পিউটার Linux ও LibreOffice-এ স্থানান্তরের মাধ্যমে এই রূপান্তরকে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে সব সরকারি নথির ফরম্যাট পরিবর্তন এবং স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও যেখানে ওপেন-সোর্স সফটওয়্যারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিচ্ছে, সেখানে আমাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য বাংলাদেশেরও অবিলম্বে এই পরিবর্তন করা জরুরি।
