[‘মিসিং শিপ’ এমন একজন মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা, যিনি প্রেম হারানোর পর শুধু প্রিয়জনকে নয়, নিজের জীবন ও অনুভূতির অর্থও নতুন করে খুঁজছেন। তিনি শিল্পের সত্যতা, প্রেমের স্বরূপ, শোকের প্রকৃতি এবং স্মৃতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ভাবছেন। কিন্তু এসব প্রশ্নের কোনো চূড়ান্ত উত্তর তার কাছে নেই। মানুষের জীবনে দুঃখের যেন একটা ছন্দ আছে, একটি দুঃখের পর আরেকটি দুঃখ। যেন ঘড়ির টিক-টক, টিক-টক! অথচ আমরা কী কী হারিয়েছি, তার হিসাব আমাদের কাছে নেই। তাই গল্পটির গভীরতম উপলব্ধি সম্ভবত এই: মানুষ শুধু যা হারিয়েছে, তার জন্যই শুধু শোক করে না বরং সে শোক করে সেই সব অনির্দিষ্ট সম্ভাবনার জন্যও, যেগুলো হারিয়ে গেছে অথচ যাদের প্রকৃত মূল্য সে কখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেনি। এ কারণেই ‘মিসিং শিপ’ কেবল প্রেমে বিচ্ছেদের গল্প নয়। এটি মানুষের অন্তর্জগতের অসম্পূর্ণতার গল্প, যেখানে ভালোবাসা ও অধিকারবোধ, সত্য ও অভিনয়, স্মৃতি ও বিস্মৃতি, আশা ও হতাশা পাশাপাশি বাস করে। জীবনের সব হারানোর হিসাব মেলানো যায় না। কখনো কখনো সেই অসম্পূর্ণ হিসাব নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়। -অনুবাদক]
বেজায় ঠাণ্ডা, চারপাশ অন্ধকার; আমরা পৌঁছে গেলাম বড্ড তাড়াতাড়ি। পার্টি-টার্টি একদম সহ্য হয় না আমার। তোমার দাদি রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার ভঙ্গিতে ছিল যেন কোনো পৌরাণিক দেবীর ছায়া। অ্যাপ্রোনের ওপর দুটো হাত আড়াআড়ি করে রাখা। তুমি আমাকে সবার সঙ্গে একটু মেলামেশা করতে বললে। পরে তুমিও এলে আমার কাছে। সিঁড়িতে বসে ছিলাম আমি। তোমাকে কিন্তু ভীষণ খুশি খুশি লাগছিল! নিজের নতুন নতুন সব পরিকল্পনার কথা বলে গেলে টানা। বলছিলে, কনসার্টের মঞ্চে গান গাওয়ার প্রস্তুতি নেবে, কঠিন কঠিন সব অডিশন দেবে, সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াবে–এমনি সব। তোমার প্রাণটাই যেন ঝলমল করছিল তোমার কপালে। আমার তেমন বলার কিছু ছিল না। আমি মনে মনে শুধু প্রার্থনা করছিলাম, যেন একটা ঝড় ওঠে, তুমি যেন যেতে না পার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাতের আকাশ পরিষ্কারই রইল। তুমি কথা বলে গেলে। ভোর হতে শুরু করল। আমার এক গোপন ইচ্ছে ছিল–নিঃশব্দে তোমার দিকে এমনভাবে ঝুঁকে পড়ব, যেন কোনো হ্রদের জলে ঝাঁপ দিচ্ছি। ঝাঁপ দেব আর তলিয়ে যাব। কিন্তু ততক্ষণে তুমি উঠে দাঁড়িয়েছ, নিজের গায়ের ধুলো ঝেড়ে নিচ্ছ।
পরদিন কালো চশমা পরলাম। কালো চশমা পরতে তুমিই বলেছিলে। তার পর বাড়ি থেকে বের হলাম, গেলাম সমুদ্রের ধারে। সেদিন পিকনিকে তুমি আমাকে বলেছিলে ‘তুমি ভাবছ, একটা ভালো কবিতা তোমাকে বাঁচিয়ে দেবে’। কিন্তু তোমার কথাটি একটা ভুল! আমার নিজেকে মনে হচ্ছিল, যেন তুচ্ছ একটা ফিঙে!
আরও পড়ুন
আমি সমুদ্রের জলে নেমে গেলাম। জল ছিল আকাশের তারাদের মতোই ঠাণ্ডা। কী দীর্ঘ সকাল! আমার কবিতাটি একটুও এগোচ্ছিল না। গ্র্যান্ড পিয়ানো নিলামে তোলা হবে, আমি বাসে চড়ে চলে গেলাম সেখানে।
কিটসের সেই গায়ক ভালুকটার কী হলো? নিলামে কয়েকজন লোকের সঙ্গে আলাপ হলো। তারাও এই প্রশ্নটা করল। তারা যেসব কথা বলছিল, সেটা সংগীততত্ত্বের আশপাশের কোনো এক অদ্ভুত কোনো কিছু। হঠাৎ তোমার জন্য মন কেমন করে উঠল। না, কিটসের কোনো গায়ক ভালুক ছিল না, ছিল বায়রনের। আমি কথাটা বলতে চেয়েও বললাম না। সেই নিলামে ছোট আকারের গ্র্যান্ড পিয়ানো বিক্রি হচ্ছিল সাত হাজার ডলারে। তোমার কথা মনে পড়ল–তুমি কীভাবে আমাকে চমকে দিয়েছিলে। বিশেষ করে তোমার দাঁতগুলো দেখে চমকে গিয়েছিলাম। নিলাম যেন আর শেষই হতে চায় না! রাত নামল। তোমাকে ছাড়াই গোটা একটা দিন কেটে গেছে আমার। একা থাকার একটা ভালো দিকও লিখে রাখি–বাতাই১ আর নয়।
তুমি সব সময় বাতাইয়ের কথা থেকে উদাহরণ টানতে। যেমন তুমি বলতে, ‘ইরোস মানে হলো–মৃত্যু পর্যন্ত, একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত ভালোবাসাকে হ্যাঁ বলা।’ রাবিশ! আসলে কি তুমি শুধু নিজের কর্তৃত্বটা ধরে রাখতে চাইতে না?
নিজের কাজের ওপর থেকে কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিলে তুমি। তোমার সংগীততাত্ত্বিক গবেষণার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আর রাখতে পারোনি। ব্যাপারটা অদ্ভুতভাবে ঘটেছিল, যেন নিজের সঙ্গেই প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলে তুমি। তুমি বলেছিলে, তোমার দাদি তোমার আট-নয় বছর বয়সের একটা ছোট্ট নোটবই খুঁজে পেয়েছেন। তার এক পাতায় সংগীতলিপির কয়েকটি পঙ্ক্তি ছিল। পরবর্তী জীবনে সংগীত ও সত্য সম্পর্কে তোমার যত উপলব্ধি, তার সবকিছুরই বীজ লুকিয়ে ছিল সেই ছোট্ট নোটবইটির পাতায়। ওই সামান্য কয়েকটি স্বরলিপিতে তুমি যেন আগুনের মতো জ্বলজ্বল করছিলে। তার চেয়ে ভালো কিছু আর কখনো করতে পারোনি। এমনকি তার সমানও হয়নি কিছু। ঈর্ষায় জিভ কামড়েছিলে। নোটবইটা সরিয়ে রেখেছিলে।
আমার মনে আছে, তখন সন্ধ্যা, শীতের শেষ দিক। আমরা একটা বনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। গলতে থাকা বরফের জল জমে ছোট ছোট পুকুর তৈরি করেছিল। তার ভেতরই খাড়া দাঁড়িয়েছিল গাছগুলো। আকাশে অন্ধকার আর সোনালি রঙের মিশেল।
আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল একটা বক্তৃতা-পরবর্তী পার্টিতে। সার্ত্র২ সেখানে ছিলেন অথবা অন্য কেউ, যিনি নিজেকে সার্ত্র বলে পরিচয় দিয়েছিলেন। গায়ে মোটা সোয়েটার। তার ভক্তদের পরনে পশমের কোট কিংবা ভেড়ার চামড়ার জ্যাকেট। সেই রাতেই তুমি প্রায় এক ঘণ্টা আমার গোপনাঙ্গে মুখ গুঁজে পড়েছিলে। অথচ, শরীরের খেলায় তুমি সক্ষম হতে পারোনি। ভোর চারটের দিকে আমি হেঁটে বাড়ি ফিরেছিলাম। গোটা শহরের ওপর যেন কেউ সদ্য ধোয়া রুমাল বিছিয়ে দিয়েছিল। ঝিকিমিকি করছিল বরফ। শারীরিক মিলনের পর একা একা বাড়ি ফেরাটা বরাবরই আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ।
কোনো কোনো দিন এমন মনে হয়, যেন চারপাশে যা কিছু তার সব একেবারে উদ্দেশ্যহীন। যেন কোনো কিছুর এক কোণ ধরে শুধু ঝুলে আছি মাত্র। মনের অবস্থার গুরুত্বই বা কতটুকু? একজন দার্শনিক ছিলেন–আমার মনে হয় হাইডেগার৩–যিনি বলেছিলেন, আমাদের যদি মনের নানা অবস্থা না থাকত, তাহলে আমরা বুঝতেই পারতাম না যে আমরা বেঁচে আছি। আমার ধারণা, তিনি খারাপ মেজাজের কথাই বোঝাতে চেয়েছিলেন। ভালো মেজাজে থাকলে আমার টুপির সৌন্দর্য কিংবা মোটরবাইকের গতি ছাড়া আর বিশেষ কিছু চোখেই পড়ে না। কিন্তু দ্বিতীয়বার ভেবে মনে হয়, তিনি হয়তো মনের এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় যাওয়ার মুহূর্তটার কথা বলেছিলেন–সেই সীমান্ত, সেই পরিবর্তনের কথা। কারণ, সত্যি বলতে কী, অলৌকিক ঘটনাটা তো সেখানেই।
ধরো, তুমি জীবনের একেবারে তলানিতে পড়ে ধুঁকছ। আত্মা ফাঁপা, তুমি নিতান্তই অসহায়, চরম হতাশ, হাল ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম–ঠিক তখনই হঠাৎ বদলে গেল সবকিছু। সীমান্ত খুলে গেল। আতঙ্ক মিলিয়ে গেল। পৃথিবী আবার আগের জায়গায় ফিরে এল। কীভাবে ঘটে এমনটা? কে এর নিয়ন্ত্রক? কেন আমি বিশ্বাস করতে পারি না যে এমন ঘটনা আবারও ঘটবে?
হায়, আমার মৃত কবিতাটি!
প্রসঙ্গত, আমার কবিতাটি মোটেল নিয়ে। আমার প্রায়ই মনে হয়, আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভালো সময়গুলো কেটেছিল মোটেলে। আর মোটেলে কাটানো সেই সেরা সময়গুলোর মধ্যেও সবচেয়ে ভালো ছিল গভীর রাতে মোটেলের সুইমিং পুলে সাঁতার কাটা। জলের নিচে ফিরোজা রঙের আলো–আলোর মধ্যে এটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়।
গাড়িতে দূরে কোথাও ভ্রমণে বেরোলে আগেভাগে মোটেল খুঁজে রাখার দায়িত্ব ছিল আমার। কয়েকবার ভুলও করেছি। যেমন, একবার মরুভূমির একটা শহরে গিয়েছিলাম আমার এক বন্ধু অভিনেতার নতুন নাটক দেখতে। থিয়েটারের পাশেই স্থানীয় মোটেলটা জ্বলজ্বল করছিল। তার সামনের অফিস সামলাত একটি পাকিস্তানি বালক, যার একটা চোখ ছিল অস্বাভাবিক রকমের চঞ্চল। তার হুইলচেয়ারের চারপাশে ব্যস্তভাবে ঘোরাঘুরি করছিল এক মহিলা, পরে জানা গেল মহিলাটি তার খালা। খারাপ মোটেল, মাছিতে ভরা খারাপ ঘর, আর ম্যাজিক ম্যাড্রিগাল নামে একটা খারাপ নাটক। আমার কাছে তাতে কোনো চমকই ছিল না।
ছোট্ট একটা থিয়েটার। অভিনেতাদের শ্বাস নিতে দেখছিলাম, পরের শ্বাসটা নেওয়ার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতেও দেখছিলাম। দেখছিলাম, তারা কীভাবে একে অন্যের চোখের দিকে তাকাচ্ছে। ব্যাপারটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল–এটাকেই কি অস্বস্তি বলে? তুমি বলেছিলে, ‘দর্শকই সব সময় ভুল জায়গায় থাকে’।
আমি বলেছিলাম, ‘তাহলে একটা কাজ করলে কেমন হয়! পৃথিবীর সব অভিনেতা একটা ঘরে ঢুকে স্রেফ পায়চারি করতে থাকবে তার পর ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। ব্যস যবনিকা! নাটক শেষ! আর কোনো নাটক নয়।’
তুমি হেসেছিলে। কিন্তু আমি ভাবছিলাম মোটেলের সেই ছেলেটার কথা। হুইলচেয়ারে বসে সে সামনের অফিসের ছোট্ট মঞ্চটা সামলাচ্ছিল। কম্পিউটারটা তার হুইলচেয়ারের উচ্চতায় রাখা, অতিথিদের জন্য কফি বানানোর যন্ত্রও ছিল। সঙ্গে প্রাচ্য ধাঁচের সকালের নাশতা। তার খালা মঞ্চকর্মীর মতো আসা-যাওয়া করছিলেন, কখনো প্লাস্টিকের কাঁটাচামচ, কখনো ছোট ছোট প্যাকেটে কমলালেবুর জেলি নিয়ে। তাদের মুখ দেখে মনে হয়েছিল, দুজনেই যন্ত্রণা পাচ্ছে।
আমি ভাবছিলাম, তারা ‘ম্যাজিক লায়ার’ নাটকটা কেমনভাবে নিতে পারে! নাটকটা বুয়েনস আইরেসের অভিজাতদের নিয়ে, যারা ইতালি আর অস্ট্রিয়ার অতীত নিয়ে স্মৃতিকাতর। স্মৃতিকাতরতা আমার একেবারেই অপছন্দ।
হয়তো অভিনয়ের মধ্যে জন্মগতভাবেই একধরনের স্মৃতিমেদুরতা আছে। মানুষের দুঃখকষ্টের প্রতি একধরনের নস্টালজিয়া, যে দুঃখকষ্ট একসময় অন্য কোথাও বাস্তব ছিল।
গাড়িতে বসে আমি তখন জেন অস্টেনের ম্যানসফিল্ড পার্ক পড়ছিলাম। উপন্যাসটিতে অভিনয় নিয়ে একটা দ্বিধা তৈরি হয়েছে। গল্পের সবচেয়ে সন্দেহজনক দুই চরিত্র এক বাড়ি ভর্তি তরুণ-তরুণীকে নিয়ে শখের নাটক মঞ্চস্থ করার প্রস্তাব দেয়। অন্যরা ইতস্তত করে। উপন্যাসের নায়িকা ফ্যানি বলে, অভিনয় তার অপছন্দ। শেষ পর্যন্ত নাটকটি দুটি মহড়ার বেশি এগোয় না। বিদেশ থেকে বাবা নির্ধারিত সময়ের আগেই ফিরে আসায় সব বন্ধ হয়ে যায়। মহড়ার মাঝখানে ধরা পড়ে যাওয়ায় অভিনেতারা এমন লজ্জা পায় যে, কয়েক সপ্তাহ তারা বাবার চোখের দিকে তাকাতেই পারে না।
আমরা নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই মোটেল ছেড়ে চলে এলাম, মনে একটা অপরাধবোধ নিয়ে। ছেলেটা আর তার খালা জানিয়ে দিল, পুরো টাকাটাই দিতে হবে। আমরা দিয়েওছিলাম।
তখন সকাল গড়িয়ে বেলা হয়েছে। সামনের অফিসে আলো জ্বলছে, পর্দা টানা, কম্পিউটার গুনগুন করছে। সব অভিনয়ই যে কাল্পনিক, তা নয়। তুমি যদি কনে হও, রেস্তোরাঁর প্রধান পরিবেশক হও, কিংবা মৃতদেহ বহন করার দায়িত্বে থাকা লোক হও, তোমাকে একটা নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করতে হয়। মানবজীবনের নানা রূপ সেখানে মূর্ত হয়ে ওঠে। বাড়ি ফেরার পথে গাড়িতে বসে আমরা একে অন্যকে এমন কথাই বলছিলাম।
কিন্তু তার পর আমার মনে পড়ল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর অভিনেতা পোলুসের গল্প। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে লেখা সোফোক্লিসের নাটক ইলেকট্রা নতুন করে মঞ্চস্থ করে তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন। পোলুস অভিনয় করেছিলেন ইলেকট্রার ভূমিকায়। নাটকের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইলেকট্রা একটি কলস হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। সে বিশ্বাস করে, কলসের মধ্যে তার ভাই ওরেস্টেসের চিতাভস্ম রয়েছে। অথচ কলসটি নকল। তার মধ্যে কিছুই নেই। আর যে লোকটি কলসটি নিয়ে আসে এবং মিথ্যা কথাগুলো বলে, সে আসলে ওরেস্টেস নিজেই।
এই কাণ্ডকারখানা নাটকের কাহিনির মধ্যে কীভাবে অর্থবহ হয়ে ওঠে, তা জানতে হলে তোমাকে নাটকটি পড়তে হবে। কিন্তু তোমার কি মনে হয় না, এই যে কলস, যার মধ্যে কথিত চিতাভস্ম আসলে নেই, সেটাই নাট্যশিল্পেরই এক অপূর্ব রূপক? সব কলসই নকল! আর শোকে বিলাপরত ইলেকট্রার কথা ধর, তার হৃদয়বিদারক শোকও শেষ পর্যন্ত কী ভয়ানক হাস্যকর!
পোলুস ছিলেন এমন এক অভিনেতা, যার ‘স্পষ্ট সংলাপ উচ্চারণ ও মার্জিত অঙ্গভঙ্গির’ জন্য আউলুস গেলিয়ুস প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু অভিনেতার চোখের জলের এই ধাঁধায় আরও একবার প্যাঁচ দিতে চাইলেন তিনি।
কারণ, সম্প্রতি পোলুস নিজেই এক প্রিয়জনকে হারিয়েছিলেন। তাই তাকে যখন ইলেকট্রার ভূমিকায় অভিনয় করতে বলা হলো, তিনি ইলেকট্রার শোকের পোশাক পরলেন। আর হাতে তুলে নিলেন নিজের ছেলের চিতাভস্মভরা কলস। তারপর দর্শকদের সামনে তিনি যে শোক প্রকাশ করলেন, তা অভিনয় করে দেখানো দুঃখ ছিল না, ছিল এক পিতার অকৃত্রিম, গভীর শোক।
এই ঘটনায় সত্য আর মিথ্যার কতগুলো স্তর যে একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তা ভাবলেই আমার মাথা ধরে যায়। আসল ছাই আর কল্পিত ছাই। অভিনেতা, অভিনয় আর শোক। যে বোন হয়েছে, সে যে আসলে বাবা। যে নারী হয়েছে, যে আসলে পুরুষ। কাহিনির অংশ হিসেবে মিথ্যা, আর বাস্তব জীবন থেকে এসে জুড়ে বসা মিথ্যা। কলস, মঞ্চের উপকরণ, অনুকরণ। দর্শক–যারা বিভ্রান্ত, মুগ্ধ, নাটকের ছলনায় প্রতারিত, আবার বাস্তবেও প্রতারিত।
পোলুস গভীর রাতে থিয়েটার থেকে বাড়ি ফিরছেন, মুখে তখনো মেকআপ লেগে আছে, পিঠের ব্যাগে কার্ডবোর্ডের কলস, তার মধ্যে ছাই।
সেই ভ্রমণের পর থেকেই আমার অনিদ্রা শুরু হয়। প্রায়ই রাতে রান্নাঘরে বসে কিটসের চিঠিগুলো পড়ি। আমার মতো তিনিও অস্থির পায়ের সমস্যায় ভুগতেন। একটা মথ একাকী বাতির চারপাশে চক্কর কাটছিল।
সালটা ১৮১৯। এ বছর কিটস তার প্রেমিকা ফ্যানিকে এমন সব চিঠি লিখেছিলেন, যেগুলো আবেগে উচ্ছ্বসিত অথচ ভীষণ অসংগত। কখনো তিনি ফ্যানিকে নিজের হৃদয়ে টেনে নিচ্ছেন, আবার কখনো দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। দাবি করছেন, ফ্যানি তাকে পুরোপুরি ‘গ্রাস করে ফেলেছ’ আবার তাকেই জানাচ্ছেন, তিনি হরিণের মতো ‘মুক্ত’ থাকতে চান। জীবনের শেষ অবলম্বন হিসেবে তিনি ফ্যানির সঙ্গে মৃত্যুকেও জুড়ে দিচ্ছেন।
আসলে তিনি কী অনুভব করতেন?
নিশ্চয়ই তিনি প্রেমে পড়তে চাইতেন। নিশ্চয়ই এই চিঠিগুলো লিখে তিনি আনন্দ পেতেন। ভাড়া করা একটি ঘরে একা বসে লিখতেন–নিজেকে জোর করে লেখার কাজে বসানোর জন্যই সেখানে গিয়েছিলেন। আর তিনি লিখতেনও, প্রতিদিন, গভীর মনোযোগে, নিবিড় ভঙ্গিতে। তবু রাতগুলো তো থেকেই যেত।
প্রেমে পড়লে আমরা সবাই একটু-আধটু খেলতে চাই, তাই না? একদিকে থাকে কাঁচা আবেগ, অন্যদিকে দড়িতে শুকোতে দেওয়া পোশাক। যেন আবেগের জন্য সাজানো নানা ছদ্মবেশ।
কিটসের ক্ষুধা ছিল বহু দিকে। তার চিকিৎসকেরা রক্ত কমানোর জন্য তাকে প্রায় অনাহারে রাখার মতো খাদ্যতালিকা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার চাওয়া আরও কত কিছু! তিনি সত্যিকারের ভালোবাসা চাইতেন; বই প্রকাশের পর মাত্র দুটো সমালোচনা নয়, আরও বেশি সমালোচনা চাইতেন। চাইতেন বই বিক্রি হোক, নিয়মিত আয় হোক, মানুষ তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিক। তিনি চাইতেন বায়রনের যা ছিল, সেটা তারও হোক! এই আকাঙ্ক্ষা তার মনকে আচ্ছন্ন করে তুলেছিল।
অনিদ্রা যখন প্রথম আমাকে গ্রাস করল, তখন আমি অন্যদের কাছে পরামর্শ চাইলাম। এক বন্ধু বলেছিল, ‘তুমি ভেড়া গুনতে পারো। তবে সচেতনভাবে গুনবে না, চোখের সামনে কল্পনা করে গুনবে। তবে হারিয়ে যাওয়া ভেড়াগুলো গুনতে যেয়ো না।’ যে একথা বলেছিল, সে বৌদ্ধ।
তখন কথাটাকে আমি নিছক রসিকতা বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু সত্যি বলতে কী, সারা রাত জেগে কিটস যদি হারিয়ে যাওয়া ভেড়াগুলোই না গুনে থাকেন তাহলে কী করছিলেন?
কারণ, গোটা শরীরেরই একটা কান্না আছে।
আর জীবন চলে খামখেয়ালিভাবে।
আর আমি কখনো জানি না, ঠিক কোন কোন ভেড়া হারিয়ে গেছে।
আর টিক-টক, টিক-টক….। দুঃখের একটি–টিক, দুঃখের আরেকটি–টক। এভাবেই আমরা এগিয়ে যাই, এভাবেই আমরা এগিয়ে এসেছি।
(গল্পটি নিউইয়র্কার পত্রিকায় ২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত)
১ জর্জ বাতাই : Georges Albert Maurice Victor Bataille, ফরাসি বুদ্ধিজীবী। তিনি দর্শন, সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান ও শিল্পকলার ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা—এসবের সমন্বয়ে গঠিত তার লেখায় কামুকতা, অতীন্দ্রিয়বাদ, পরাবাস্তববাদ এবং প্রথা-লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো অন্বেষণ করা হয়েছে।
২ জাঁ পল সার্ত্র : Jean-Paul Sartre, ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, নাট্যকার, সাহিত্যিক ও সমালোচক। অস্তিত্ববাদ ও প্রপঞ্চবিজ্ঞান দর্শনের অন্যতম পথিকৃৎ।
৩ মার্টিন হাইডেগার : Martin Heidegger, জার্মান দার্শনিক। কন্টিনেন্টাল দর্শন ধারণার অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়।
অনুবাদক: মলয় পাঁড়ে
