বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের রবিবারের (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যাটি শুরু হয়েছিল আর দশটা দিনের মতোই। ফুটবল খেলা, ভক্তদের সঙ্গে ছবি তোলা, তারপর বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেন এই তারকা। কিন্তু, মুম্বাইয়ের জুহুর বাড়িতে ফেরার পথে তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা মুহূর্তেই উৎসবের পরিবেশ পরিণত হয় আতঙ্কে। টাইগার প্রাণে বাঁচলেও গুলিবিদ্ধ হন তার গাড়িচালক, আহত হন আরেক ব্যক্তি। ঘটনার পর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলিউড তারকারা, নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছেন মহারাষ্ট্র সরকার, আর তদন্তে নেমেছে পুলিশ।
ফুটবল মাঠ থেকে বাড়ি ফেরার পথে হামলা
রবিবার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের জুহুর পুষ্পা পার্ক এলাকায় একটি ফুটবল ম্যাচে অংশ নিয়েছিলেন টাইগার শ্রফ। ম্যাচে তার সঙ্গে ছিলেন আরো ১৭ জন খেলোয়াড়। তাদের মধ্যে ছিলেন অভিনেতা অপারশক্তি খুরানা, অভিমন্যু দাসানি, করণবীর মেহরা, অভিষেক বাজাজ এবং কোরিওগ্রাফার সিজার গনসালভেস। ম্যাচে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে টেলিভিশন জগতের অনেক পরিচিত মুখও ছিলেন।
মাঠের আশপাশে তখন বেশ উৎসবমুখর পরিবেশ। কাছেই একটি শিশুর জন্মদিনের অনুষ্ঠান চলছিল। নবরাত্রি উপলক্ষে আতশবাজিও ফুটছিল। অন্যদিকে, প্রিয় তারকাদের একনজর দেখতে এবং ছবি তুলতে ভিড় করেছিলেন ভক্তরা।
ম্যাচ শেষে টাইগার বাড়ি ফেরার জন্য গাড়িতে ওঠেন। ঠিক তখনই সন্ধ্যা সাতটার দিকে মোটরসাইকেলে আসা তিন ব্যক্তি তার গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের মধ্যে দুজন গুলি চালায়, আরেকজন মোটরসাইকেলে অপেক্ষা করছিল। কয়েকটি প্রতিবেদনে পাঁচটি গুলি ছোড়ার কথা বলা হয়েছে, আবার অন্য প্রতিবেদনে গুলির সংখ্যা সাত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
টাইগারের গায়ে গুলি লাগেনি। তবে, গুলির আঘাত ও গাড়ির কাচের টুকরো থেকে তার শরীরে সামান্য আঘাত লাগে। তার ডান হাতে বারুদের কারণে পোড়ার দাগও ছিল। আহত হন গাড়িচালক ফিরদৌস এবং কাছাকাছি থাকা আরেক ব্যক্তি, যাকে কিছু কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কোনো কোনো প্রতিবেদনে পথচারী, আবার কোনো প্রতিবেদনে অটোরিকশাচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গুলি চালানোর পর হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে দ্রুত পালিয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, টাইগার প্রতি রবিবার ওই এলাকায় ফুটবল খেলতে আসেন; এ তথ্য হামলাকারীদের জানা থাকতে পারে। সে কারণেই তারা আগে থেকে সেখানে অপেক্ষা করছিলেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আতশবাজি ভেবে ভুল করেছিলেন অনেকে
ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুম্বাইয়ের ভ্লগার সালমা শেখ। টাইগারকে নিয়ে ভিডিও তৈরি করার জন্য তিনি মাঠে গিয়েছিলেন। অভিনেতা গাড়িতে ওঠার আগেও তাকে ডেকেছিলেন সালমা।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, “যেই সে প্রধান সড়কে পৌঁছাল, একটি ছেলে বন্দুক দিয়ে গুলি চালাতে শুরু করল। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, এটা দিওয়ালির আতশবাজির শব্দ।”
সালমার বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর গাড়িটি থেমে যায় এবং টাইগার গাড়ির ভেতরে নিচু হয়ে পড়েন। টাইগারের গায়ে কোনো আঁচড়ও লাগেনি। তবে, তার চালক গুলিতে আহত হন। চালকের কনুইয়ে গুলি লাগে এবং আরেকটি গুলি তার হাতের তালু ভেদ করে বেরিয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, “আহত চালককে প্রথমে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, পরে সেখান থেকে নানাবতী হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা পরে সেখান থেকে চলে গেলেও চালক তখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।”
ঘটনার আরেক প্রত্যক্ষদর্শী শাহরুখ শেখ সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, “ঘটনার সময় আমি গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমরা গাড়িটির আসার অপেক্ষা করছিলাম, যাতে ছবি তুলতে পারি। কী ঘটতে চলেছে, তা আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না।”
তিনি জানান, মুহূর্তের মধ্যে দুজন ব্যক্তি এসে চারটি গুলি ছোড়েন। তাদের লক্ষ্য ছিল গাড়ির ঠিক সেই আসনটি, যেখানে টাইগার বসেছিলেন। এরপর তারা দ্রুত নিজেদের গাড়িতে উঠে পালিয়ে যান।
গুলির সময় টাইগার গাড়ির ভেতরে নিচু হয়ে পড়েন। টাইগারের গুরুতর কিছু না হলেও তার চালক গুলিতে আহত হন
শাহরুখের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি গুলি চালকের গায়ে লাগে এবং গাড়ির পাশে হাঁটতে থাকা এক ভক্তের পেটেও গুলি লাগে। তিনি আরো জানান, প্রথমে চালক গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তিনি আহত হওয়ার পর টাইগার গাড়ির ভেতরে আসন বদলে নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যান।
তবে, হামলার পর টাইগার কীভাবে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন বা হাসপাতালে পৌঁছান, তা নিয়ে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিবরণের কিছু পার্থক্য রয়েছে।
আতঙ্কের মুহূর্ত দেখেছেন করণবীর মেহরাও
ফুটবল ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা করণবীর মেহরা। এনডিটিভিকে তিনি জানান, তার গাড়ি টাইগারের গাড়ির ঠিক পেছনে ছিল।
করণবীর বলেন, “আমার গাড়ি ঠিক পেছনেই ছিল। গেট পার হয়ে আমার গাড়ি যখন এগোল, তখন আমি শুধু রক্তের দাগ দেখতে পেলাম। এরপর জানতে পারলাম, টাইগারের চালককে গুলি করা হয়েছে। তাই আমি শুধু খুশি যে টাইগার নিরাপদ আছে। তবে, চালকের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছে। আশা করি, তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন।”
তিনি আরো জানান, ঘটনাস্থলের কাছেই কয়েকটি শিশু জন্মদিন উদযাপন করছিল। গুলির শব্দে সবাই ছোটাছুটি শুরু করে। প্রথমে আতশবাজির শব্দের সঙ্গে গুলির শব্দ গুলিয়ে ফেলেছিলেন তারা। পরে লোকজনের চিৎকার শুনে বুঝতে পারেন, গুরুতর কিছু ঘটেছে।
করণবীর বলেন, “আমি টাইগারকে অনেক দিন ধরে চিনি। সে খুব ভালো মানুষ। নিজের কাজ নিয়ে থাকে এবং সবার সঙ্গে সব সময় সম্মান দিয়ে কথা বলে। তার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটতে দেখা খুবই দুঃখজনক। তার পরিবারের সঙ্গেও আমার ভালো পরিচয় রয়েছে।টাইগার ও তার পরিবারকে এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে দেখে আমার নিজেরও মানসিকভাবে খুব খারাপ লাগছে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তরাই প্রথম চিৎকার করে ওঠেন। গুলির শব্দে আতশবাজির আওয়াজ থেমে যায়। তখন নিরাপত্তাকর্মীরা সতর্ক হন এবং পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। তবে, ততক্ষণে টাইগার তার চালককে নিয়ে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলেন।”
টাইগারের বাবা, অভিনেতা জ্যাকি শ্রফও ছেলের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। রেডিফকে তিনি বলেন, “সব ঠিক আছে। টাইগার থানায় আছে। সে আহত হয়নি। তার চালকের হাতে আঘাত লেগেছে।”
হাসপাতালে চিকিৎসা, বাড়িতে পুলিশি নিরাপত্তা
ঘটনার পর টাইগার ও তার চালককে চিকিৎসার জন্য নানাবতী হাসপাতালে নেওয়া হয়। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, টাইগারের শরীরে গুলির ক্ষত ছিল না। তবে, তার তার শরীরে সামান্য আঘাত ও ঘষা লেগে যাওয়ার চিহ্ন ছিল।
মুম্বাই পুলিশের উপ-কমিশনার মোহিত গর্গ জানান, এ ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন। চালক ফিরদৌসের হাতে গুলি লেগেছে। তার আঘাত গুরুতর নয় এবং তিনি বিপদমুক্ত। অন্য আহত ব্যক্তি উমেশ চবনের শরীরে গুলি লেগেছে। দুজনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর টাইগারের বাড়িতে যান মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে। তখন টাইগারের ডান হাত ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল। তার বুক ও ডান কাঁধেও আঘাতের চিহ্ন ঢেকে রাখা হয়েছিল। এ সময় তার বাবা জ্যাকি শ্রফও উপস্থিত ছিলেন।
শিন্ডে সাংবাদিকদের বলেন, “এটি একটি বড় ঘটনা। পাঁচ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল। তবে, সৌভাগ্যবশত তিনি নিরাপদে আছেন। তার চালক আহত হয়েছেন। ঘটনাটি নিন্দনীয়।”
হামলার পর টাইগার শ্রফের বাড়িতে গিয়ে তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে
তিনি আরো বলেন, “আমি অভিনেতার সঙ্গে দেখা করেছি। বারুদ ও কাচের টুকরোর কারণে তার বাম হাতে আঘাত লেগেছে। তিনি এবং তার মা দুজনেই বেশ আতঙ্কিত।”
শিন্ডে জানান, জনপরিচিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার ঘটনা সরকার মেনে নেবে না। তিনি বলেন, “আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি, এ ধরনের প্রকাশ্য হুমকির মুখে রাজ্য সরকার তাদের পাশে রয়েছে। কোনো ধরনের হুমকি সহ্য করা হবে না। মানুষকে ভয় দেখানোর এ ধরনের চেষ্টা সহ্য করা হবে না। আমরা এই গুন্ডামির অবসান ঘটাব।”
মুম্বাইয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক গুলির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিন্ডে বলেন, “২০২৪ সালে রাজনীতিবিদ বাবা সিদ্দিকি খুন হওয়ার পর থেকে এ ধরনের ঘটনা বেশি আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে সালমান খানের বান্দ্রার বাড়ি গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টস এবং পরিচালক রোহিত শেঠির বাড়ির বাইরে গুলি চালানোর ঘটনাও রয়েছে।”
শিন্ডের দাবি, ১৯৯৫ সালের মধ্যে মুম্বাই পুলিশ আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা দমনে সফল হয়েছিল। এবারও একইভাবে অপরাধীদের দমন করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
টাইগারের বাড়ির বাইরে নিরাপত্তা বাড়ানো হযয়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে প্রকাশিত ভিডিওতে তার বাড়ির সামনে পুলিশের উপস্থিতি দেখা যায়। হামলার পর তার বোন কৃষ্ণা শ্রফ এবং সাবেক প্রেমিকা দিশা পাটানিও তাকে দেখতে বাড়িতে যান।
মিকা সিং ও শত্রুঘ্ন সিনহার উদ্বেগ
টাইগারের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বলিউডের একাধিক তারকা। তাদের মধ্যে ছিলেন সংগীতশিল্পী মিকা সিং, অভিনেতা ও রাজনীতিক শত্রুঘ্ন সিনহা, পরিচালক রাহুল ঢোলাকিয়া এবং অভিনেতা করণবীর মেহরা।
সোমবার সকালে ইনস্টাগ্রামে একটি সেলফি ভিডিও পোস্ট করেন মিকা সিং। সেখানে তিনি বলেন, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, টাইগার বেঁচে গেছে। আমি শুধু ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব, সে যেন এভাবেই নিরাপদ ও সুস্থ থাকে।”
এরপর মুম্বাইয়ে নিজের শুরুর দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন মিকা। তিনি জানান, ২০০৫ সালে মুম্বাইয়ে আসার পর পাঞ্জাবে নিজের এলাকার মানুষদের বলতেন, মুম্বাই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। এখানে মানুষ কোনো নিরাপত্তা ছাড়াই ভোর ছয়টা পর্যন্ত কাজ করতে পারে।
মিকার কথায়, “টাইগার শ্রফের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা এখন একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যখন মানুষ ডান্ডিয়া উৎসবের মৌসুম উদযাপন করছে, তখন এত বড় একটি ঘটনা ঘটল। তাই আমি সরকারের কাছে হাতজোড় করে আবেদন জানাচ্ছি, দয়া করে এই ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন। আজ টাইগারের সঙ্গে ঘটেছে, কাল অন্য কারো সঙ্গেও ঘটতে পারে।”
অন্যদিকে, সোমবার সকালে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে উদ্বেগ প্রকাশ করেন শত্রুঘ্ন সিনহা। তিনি লেখেন, “কী হচ্ছে এসব????
গতকালের মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক হামলা, হুমকি, লক্ষ্য করে গুলি চালানো—সবকিছুই সবচেয়ে প্রিয় তারকা টাইগার শ্রফকে ঘিরে, যিনি অত্যন্ত যোগ্য পিতার অত্যন্ত যোগ্য সন্তান।”
তিনি আরো লেখেন, “আসলে টাইগার ভাগ্যবান যে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে গেছে, কিন্তু তার বেচারা চালক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। মহারাষ্ট্রের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিসকে এই গুরুতর বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন বলে মনে হচ্ছে।”
বলিউডের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
টাইগারের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে ফেডারেশন অব ওয়েস্টার্ন ইন্ডিয়া সিনে এমপ্লয়িজ (এফডব্লিউআইসিই)। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে এ হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এ ধরনের সহিংসতা ও ভয় দেখানোর চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে, ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, চলচ্চিত্রশিল্পের একজন পরিচিত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এ ধরনের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে পরিচালক রোহিত শেঠির বাড়ির বাইরে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছিল। একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত, কার্যকর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রোহিত শেঠির বাড়ির বাইরে গুলি চালানোর ঘটনার পর তার বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করেছিল মুম্বাই পুলিশ। এবার টাইগারের বাড়ির বাইরেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
এফডব্লিউআইসিই এ ঘটনার নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বলিউড তারকাদের লক্ষ্য করে একের পর এক হামলার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য মহারাষ্ট্র সরকার ও মুম্বাই পুলিশের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
তদন্তে ১৫টি দল, গ্রেপ্তার তিন সন্দেহভাজন
ঘটনার পর হামলাকারীদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করে মুম্বাই পুলিশ। একজন পুলিশ কর্মকর্তা পিটিআইকে জানান, ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখতে মুম্বাই পুলিশের অপরাধ দমন শাখা ও স্থানীয় পুলিশের সদস্যদের নিয়ে মোট ১৫টি দল গঠন করা হয়েছে।
তদন্তে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হয়। প্রাথমিকভাবে দুই সন্দেহভাজনের ছবি প্রকাশ্যে আসে। হামলার পর মোটরসাইকেলটি আন্ধেরি পশ্চিমের একটি রেলস্টেশনের বাইরে রেখে যাওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ জানতে পারে।
সোমবারের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, টাইগারের গাড়িতে গুলি চালানোর ঘটনায় সন্দেহভাজন তিন ব্যক্তিকে রাজস্থানের কোটায় আটক করা হয়েছে। মুম্বাই পুলিশের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজস্থানের অ্যান্টি-গ্যাংস্টার টাস্ক ফোর্স ও কোটা সিটি পুলিশের যৌথ দল তাদের আটক করে। তারা পুনে-জয়পুর এক্সপ্রেসে ভ্রমণ করছিলেন বলে জানা গেছে।
কোটা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মধ্যে দুজন সরাসরি গুলি চালানোর ঘটনায় জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তৃতীয় ব্যক্তি মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালক হিসেবে কাজ করতেন বলে জানা গেছে। তবে, তাদের ভূমিকা ও হামলার পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তদন্ত চলছে।
এদিকে, লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা একটি গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পুলিশ তদন্ত করছে। হামলার সঙ্গে গোষ্ঠীটির প্রকৃত যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বলিউডে হামলার দীর্ঘ ইতিহাস
টাইগার শ্রফকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা বলিউডের পরিচিত ব্যক্তিদের ওপর হামলার ধারাবাহিকতার মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
১৯৯৭ সালে মুম্বাইয়ে নিজের অফিসের বাইরে গুলির মুখে পড়েও বেঁচে যান পরিচালক রাজীব রাই। একই বছর আন্ধেরিতে একটি মন্দিরের বাইরে গুলি করে হত্যা করা হয় টি-সিরিজের প্রতিষ্ঠাতা গুলশন কুমারকে।
২০০০ সালে সান্তাক্রুজে নিজের অফিসের বাইরে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন পরিচালক রাকেশ রোশন। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালের এপ্রিলে সালমান খানের বান্দ্রার বাড়ির বাইরে গুলি চালানো হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর প্রদেশের বেরেলিতে অভিনেত্রী দিশা পাটানির পরিবারের বাড়ির বাইরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মুম্বাইয়ের জুহুতে পরিচালক রোহিত শেঠির বাড়ির বাইরে গুলি চালানো হয়।
একের পর এক এমন ঘটনা চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। টাইগারের ঘটনায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও আহত হয়েছেন তার গাড়িচালক ও আরেক ব্যক্তি। এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য হামলাকারীদের উদ্দেশ্য ও সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করা, যাতে ঘটনার পেছনের পুরো রহস্য সামনে আসে।
* দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে
