কানাডায় নতুন জীবন গড়তে এসে যে মানুষগুলোর ওপর ভরসা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁদের হাতেই হারিয়েছেন নিজের স্বাধীনতা, আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনের স্বস্তি। আদালতে দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশি নারীটি বলেছেন, একসময় তিনি ছিলেন স্বাবলম্বী, নিজের আয় ছিল, কারও কাছে কিছু চাইতে হতো না। এখন মানুষকে বিশ্বাস করতেও ভয় পান। প্রায় চার বছর আগে শুরু হওয়া সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার বিচার শেষে সাসকাচুয়ানের আদালত দুই বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীকে দীর্ঘ কারাদণ্ড দিয়েছেন। মোহাম্মদ মাসুমকে মানবপাচার ও তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মোট ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সোহেল হায়দারকে মানবপাচারের দায়ে দেওয়া হয়েছে চার বছরের কারাদণ্ড।
২২ অক্টোবর সাসকাটুনের প্রাদেশিক আদালতে বিচারক মিগেল মার্টিনেজ এই সাজা ঘোষণা করেন। মাসুমের জন্য প্রসিকিউশন ১৫ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছিল। তাঁর আইনজীবীরা সাত থেকে নয় বছরের সাজা চেয়েছিলেন। অন্যদিকে হায়দারের জন্য প্রসিকিউশন সাড়ে পাঁচ বছরের সাজা চাইলেও তাঁর আইনজীবী মানবপাচারের অপরাধে নির্ধারিত ন্যূনতম চার বছরের সাজা দেওয়ার আবেদন করেন। বিচারক শেষ পর্যন্ত হায়দারের ক্ষেত্রে চার বছর এবং মাসুমের ক্ষেত্রে মোট ১৪ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করেন।
শাস্তি শুধু কারাদণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আদালত ভুক্তভোগীর বকেয়া মজুরি বাবদ হায়দারকে ৫ হাজার ৮৮৫ ডলার ১৬ সেন্ট এবং মাসুমকে ১২ হাজার ২৬৮ ডলার পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। দুজনকেই ডিএনএ নমুনা দিতে হবে। তাঁদের ওপর অস্ত্র রাখার নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় কিংবা ভবিষ্যতেও ওই নারীর সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ কোনো যোগাযোগ করতে পারবেন না তাঁরা। আর তিনটি যৌন নিপীড়নের অপরাধে মাসুমকে ২০ বছরের জন্য কানাডার জাতীয় যৌন অপরাধী নিবন্ধনে থাকতে হবে। সাজা ঘোষণার আগে ৭৬ দিন হেফাজতে থাকার কারণে দুজনেরই সাজার মেয়াদে ১১৪ দিন সমন্বয় করা হয়েছে।
মাসুমের ১৪ বছরের সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও আদালত প্রতিটি অপরাধ আলাদাভাবে বিবেচনা করেছেন। সব অভিযোগের প্রকৃতি, ভুক্তভোগীর ওপর প্রভাব এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিচারক শেষ পর্যন্ত তাঁর মোট সাজা ১৪ বছর নির্ধারণ করেন। এর মধ্যে মানবপাচারের জন্য চার বছর এবং তিনটি যৌন নিপীড়নের জন্য যথাক্রমে তিন, পাঁচ ও দুই বছরের সাজা ধার্য করা হয়েছে। সব সাজা ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে।
মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বাংলাদেশি নারীটির পরিচয় আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রকাশ করা হয়নি। নথিতে তাঁকে S.K. নামে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে তাঁর উচ্চশিক্ষা, ভালো চাকরি ও স্বাবলম্বী জীবন ছিল। ২০২২ সালের আগস্টে ভিজিটর ভিসায় কানাডায় এসে প্রথমে টরন্টোয় ছিলেন তিনি। কানাডায় কাজ করার সুযোগ খুঁজতে গিয়ে সোহেল হায়দারের একটি চাকরির বিজ্ঞাপন তাঁর নজরে আসে। সেই যোগাযোগের সূত্রেই তিনি সাসকাচুয়ানে যান।
আদালতে উঠে এসেছে, হায়দার তাঁকে Gull Lake-এর একটি রেস্তোরাঁয় কাজের ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করলেও তিনি উপযুক্ত মজুরি পাননি। দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা, সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। চাকরি, থাকা-খাওয়া এবং কাজের অনুমতিপত্রের জন্য তিনি ক্রমেই হায়দারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বিচারক সাজা ঘোষণার সময় বলেছেন, এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে হায়দার তাঁর কোথায় থাকা ও কোথায় কাজ করা হবে, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
পরে ওই নারীকে Gull Lake থেকে Tisdale এবং Elrose-এ নিয়ে যাওয়া হয়। Tisdale-এ মোহাম্মদ মাসুমের রেস্তোরাঁয় কাজ করার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আদালত দীর্ঘ বিচার শেষে মাসুমকে মানবপাচারের পাশাপাশি তিনটি যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। প্রসিকিউশনের বক্তব্য ছিল, একজন নতুন অভিবাসী হিসেবে তাঁর দুর্বল অবস্থার সুযোগ নিয়ে শ্রম আদায়ের পাশাপাশি মাসুম নিজের যৌন স্বার্থেও তাঁকে শোষণ করেছেন। কোনো কোনো যৌন নিপীড়নের ঘটনায় শারীরিক সহিংসতাও ছিল বলে আদালতে বলা হয়েছে।
এই মামলার মানবপাচার ছিল মূলত কর্মসংস্থানভিত্তিক বা শ্রমভিত্তিক মানবপাচার। অর্থাৎ ওই নারীর চাকরি, কাজের অনুমতিপত্র, বাসস্থান ও আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এক শহর থেকে আরেক শহরে নিয়ে যাওয়া, দীর্ঘ সময় কাজ করানো, উপযুক্ত মজুরি না দেওয়া এবং তাঁর অসহায় অভিবাসন পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার ঘটনাগুলোকে আদালত মানবপাচারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।
সাজা ঘোষণার সময় আদালতে পড়ে শোনানো ভুক্তভোগীর বক্তব্য মামলাটির মানবিক দিকটিকে আরও স্পষ্ট করেছে। তিনি জানিয়েছেন, কানাডায় আসার আগে তাঁর নিজের জীবন, কর্মজীবন ও আত্মসম্মান নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। কিন্তু এই ঘটনার পর মানুষের সঙ্গে কথা বলা কিংবা নতুন কিছু শুরু করার ক্ষেত্রেও তিনি ভয় অনুভব করেন। নিজের পরিবারও বাংলাদেশে সামাজিক চাপের মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। একপর্যায়ে তিনি বলেছেন, যাঁদের একই দেশ ও একই সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করেছিলেন, সেই বিশ্বাসই ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউটর লেসলি ডানিং আদালতে বলেন, দুই ব্যক্তি ওই নারীর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কানাডায় আসার পর ওই নারীর জীবনের প্রায় প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। হায়দারের ক্ষেত্রে শারীরিক সহিংসতা বা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ না থাকায় বিচারক মানবপাচারের ন্যূনতম চার বছরের সাজাকেই যথেষ্ট মনে করেছেন। তবে বিচারক এটিও বলেছেন, নারীটিকে সাসকাচুয়ানে নিয়ে আসা, কোথায় থাকবেন ও কাজ করবেন তা নিয়ন্ত্রণ করা এবং কাজের অনুমতিপত্র, খাবার ও আশ্রয়ের জন্য তাঁর নির্ভরশীলতার সুযোগ নেওয়ার পরিকল্পনায় হায়দারের ভূমিকা ছিল।
মাসুমের ক্ষেত্রে আদালতের বিবেচনা ছিল অনেক বেশি কঠোর। প্রসিকিউশন বলেছে, তাঁর অপরাধ ছিল দীর্ঘ সময় ধরে চলা শ্রম, মানসিক ও যৌন শোষণের সমন্বিত ঘটনা। মাসুমের আইনজীবীরা তাঁর পরিবার, সন্তান এবং কমিউনিটির কয়েকজনের সমর্থনপত্র আদালতে তুলে ধরে সাজা কমানোর আবেদন করেছিলেন। কিন্তু বিচারক অপরাধগুলোর প্রকৃতি ও ভুক্তভোগীর ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিবেচনা করে ১৪ বছরের মোট সাজা নির্ধারণ করেন।
এই মামলাটিকে সাসকাচুয়ানে মানবপাচারের বিচারের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখছেন ক্রাউন প্রসিকিউটররা। কারণ এটি সীমান্ত পেরিয়ে কাউকে পাচার করে আনার প্রচলিত ঘটনার মামলা নয়। একজন নবাগত অভিবাসীর চাকরি, বাসস্থান, মজুরি ও অভিবাসন পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তাঁকে শ্রমে বাধ্য করার ঘটনাকেও যে মানবপাচার হিসেবে আদালত বিবেচনা করতে পারে, এই মামলার রায় ও সাজা ভবিষ্যতের মামলাগুলোতে সেই দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তথ্যসূত্র:
620 CKRM, October 23, 2026
Global News, October 23, 2026
