জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশ প্রতি এক মার্কিন ডলার অনুদানের বিপরীতে প্রায় ২ দশমিক ৭০ ডলার ঋণ পেয়েছে। অভিযোজন খাতের অর্থায়নের ৫৮ শতাংশই এসেছে ঋণ হিসেবে। জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় অর্থায়নের এই ধরণ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠির কাছে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন পৌঁছানো এবং স্থানীয় পর্যায়ে এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর শেরাটন অ্যানেক্সে ‘প্যারিস থেকে আন্তালিয়া: জলবায়ু ও প্রকৃতির জন্য অর্থায়ন বিষয়ক একটি প্রতিফলন’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এ সংলাপে সহযোগিতা করে ওয়াটারএইড বাংলাদেশ এবং সহায়তা দেয় সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি)।
সংলাপে ‘ন্যাচার অ্যান্ড গভর্ন্যান্স পলিসি প্ল্যাটফর্ম’ (এনজিপিপি) নামে একটি স্বাধীন উপদেষ্টা প্ল্যাটফর্মেরও যাত্রা শুরু হয়। জলবায়ু, প্রকৃতি ও সুশাসন বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও দক্ষতার সংযোগ তৈরিতে কাজ করবে প্ল্যাটফর্মটি।
আয়োজকদের গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু অর্থায়নের বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থের পরিমাণ নয়; বরং বৈশ্বিক পর্যায় থেকে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থের সুষম বণ্টন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিষেবা সচল রাখা। ‘গোফোরইমপ্যাক্ট’ (GO4IMPact) কর্মসূচির আওতায় সাতক্ষীরা ও নওগাঁ অঞ্চলে পরিচালিত মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলের মাত্র ৩৫ শতাংশ পরিবার সারা বছর নিরাপদ পানি পায়।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের পর্যবেক্ষণ বলছে, স্থানীয় বাজেটে পানি ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে অবকাঠামো নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও সেগুলোর সুফল দীর্ঘ মেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
আয়োজকদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঋণের পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অর্থ পৌঁছানো এবং প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও পানি ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবা সচল রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স দীপক এলমার এবং সংসদ সদস্য মানসুরা আক্তার।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. জাকির হোসেন খান। এতে নীতিনির্ধারক, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গবেষক, তরুণ প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান বলেন, মানবজাতি পৃথিবীর প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার জন্য নির্ধারিত নয়টি ‘প্ল্যানেটারি বাউন্ডারিস’ বা গ্রহের সীমানার মধ্যে সাতটি অতিক্রম করেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রকৃতি ও মানুষের মৌলিক অধিকারকে উন্নয়নের কেন্দ্রে রেখে নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
তিনি ‘প্রাকৃতিক অধিকার-নেতৃত্বাধীন সুশাসন’ বা ন্যাচারাল রাইটস-লেড গভর্ন্যান্সের (এনআরএলজি) ধারণার ওপর গুরুত্ব দেন।
জাকির হোসেন খান বলেন, আমার অক্সিজেন দরকার, আমার বিশুদ্ধ পানি দরকার, এ বিষয়ে আমি কোনো আপস করতে পারি না।
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণের বোঝা কমানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের বাইরে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঋণ মওকুফ কোনো বিকল্প নয়, এটি একটি বাধ্যবাধকতা।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন যেন প্রকৃত সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায়, সে ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকৃতি রক্ষার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধি অর্জনে সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রধান অতিথি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের নতুন প্ল্যাটফর্মের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সদস্যদের দায়িত্ব গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতে হবে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকৃত চ্যালেঞ্জগুলো মাঠপর্যায়ে ও গ্রামে বেশি দৃশ্যমান।
জলবায়ু অর্থায়ন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কত টাকা পাওয়া গেল, শুধু তা বিবেচনা না করে অর্থের ব্যবহার ও জনকল্যাণে তার প্রভাব যাচাই করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, আমরা যে অর্থ ধার করি, তা কি আমরা সঠিক উপায়ে ব্যবহার করেছি? এটাই প্রশ্ন।
পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থানীয় জনগণের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিকল্পনা একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু হওয়া উচিত, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রাসাদে নয়।
নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দয়া করে সরকারের সাথে দেখা করুন, কথা বলুন, পরামর্শ দিন।
তিনি চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্ল্যাটফর্মের সদস্যদের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সামনে রেখে কাজ করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স দীপক এলমার বলেন, জলবায়ু ও প্রকৃতির জন্য অর্থায়ন থেকে দীর্ঘস্থায়ী ফল পেতে কার্যকর সুশাসন জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর সুস্পষ্ট দায়িত্ব, পর্যাপ্ত সম্পদ ও পরিষেবা দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, জলবায়ু এবং প্রকৃতির অর্থায়ন তখনই ফলাফল নিয়ে আসে যখন প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষম হয়, দায়িত্বগুলো স্পষ্ট থাকে, সিদ্ধান্তগুলো প্রমাণের ভিত্তিতে হয় এবং অগ্রাধিকার নির্ধারণে মানুষের মত প্রকাশের সুযোগ থাকে।
প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও অবকাঠামো ও পরিষেবা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
দীপক এলমার বলেন, জলবায়ু অর্থায়নের প্রকৃত মাপকাঠি এটা নয় যে আমরা কতটা অর্থ সংগ্রহ করি, বরং এটি কতটা কার্যকরভাবে মানুষের জীবনমান উন্নত করে, প্রকৃতিকে রক্ষা করে এবং অনাগত প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।
সংসদ সদস্য মানসুরা আক্তার বলেন, সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে এ ধরনের উদ্যোগে যুক্ত করা না গেলে সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। তাই নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জাতীয় সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, আমার ঘরে আগুন লেগেছে, আমাকে নিজেই আগুন নেভাতে হবে; আমাকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতির অবক্ষয় ও দূষণকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলবায়ু, প্রকৃতি এবং দূষণ- এই ত্রিবিধ বৈশ্বিক সংকট আলাদাভাবে মোকাবিলা করার কোনো সুযোগ নেই।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির সমন্বিত পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও মালিকানা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগগুলোতে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ফজলে রাব্বি ছাদেক আহমাদ বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়া বাংলাদেশের অধিকার, বিশেষ করে অভিযোজন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে।
আইইউসিএন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা এস. হোসেন বলেন, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে কোনো কার্যকর মডেল প্রমাণ করা সম্ভব হলেও প্রকল্প শেষ হওয়ার পর তা চালু রাখতে অব্যাহত অর্থায়ন ও ক্ষমতায়িত স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রয়োজন।
মালেয়া ফাউন্ডেশনের মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা বলেন, জলবায়ু বিষয়ে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ ন্যায্য, সাংস্কৃতিকভাবে উপযোগী, প্রকৃতিনির্ভর এবং অধিকারভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন।
চালু হলো ন্যাচার অ্যান্ড গভর্ন্যান্স পলিসি প্ল্যাটফর্ম
সংলাপের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা এনজিপিপি একটি স্বাধীন উপদেষ্টা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও দক্ষতার ভিত্তিতে জলবায়ু, প্রকৃতি ও সুশাসন বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক নীতি প্রণয়নে নীতিনির্ধারকদের সহায়তা করবে এটি। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ প্ল্যাটফর্মটির কারিগরি সচিবালয়ের দায়িত্ব পালন করবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রাথমিকভাবে প্ল্যাটফর্মটির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালনে সম্মত হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠাতা কোর সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্য শেখ ফরিদুল ইসলাম, সংরক্ষিত নারী আসন-১৩-এর সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা, সংসদ সদস্য মানসুরা আক্তার, নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক, জলবায়ু পরিবর্তন ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং পিকেএসএফের সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ফজলে রাব্বি ছাদেক আহমাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মী এবং গ্রিনওয়াচবিডির সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার।
প্ল্যাটফর্মটির সদস্যরা ব্যক্তিগত সক্ষমতায় দায়িত্ব পালন করবেন এবং পর্যায়ক্রমে সদস্যপদ সম্প্রসারণ করা হবে।
সমাপনী বক্তব্যে ওয়াটারএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর (ইন-চার্জ) মো. তাহমিদুল ইসলাম বলেন, তরুণ প্রতিনিধিরা জলবায়ু অর্থায়নে স্বচ্ছতা চান। তিনি এনজিপিপির কার্যক্রমের সফলতা কামনা করেন এবং ভবিষ্যতেও সরকারের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
জেইউ/ এনটি
