মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে নিছক একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাশিয়াবিরোধী নতুন শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের ঠিক আগে সেগুলো স্থগিত করার মাধ্যমে তিনি মূলত একটি বাস্তব সত্য স্বীকার করেছেন: বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতিকে উপেক্ষা করে ভূরাজনীতি চালানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মস্কোকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখার লক্ষ্যও স্পষ্ট ছিল। কিন্তু যখন সেই চাপের অভিঘাত গিয়ে পড়ে জ্বালানি বাজারে, সরবরাহ ব্যবস্থায় এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর, তখন বাস্তবতা রাজনীতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
সবচেয়ে বড় স্বস্তি পেয়েছে ভারত ও চীন। কারণ গত কয়েক বছরে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের প্রধান ক্রেতা হিসেবে এই দুই দেশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পথে যেত, তাহলে শুধু নয়াদিল্লি বা বেইজিং নয়, বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থাই নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ত। এমনকি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পরও কেন পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে পুরোপুরি কোণঠাসা করতে পারল না? উত্তরটি সহজ। কারণ বিশ্ব অর্থনীতি এখন আর একমুখী নয়। নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী শক্তিগুলোর বিকল্প বাজার রয়েছে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু দেশগুলোরও বিকল্প ক্রেতা রয়েছে। রাশিয়ার তেল ইউরোপে না গেলে এশিয়ায় যাচ্ছে, এশিয়া কিনলে বিশ্বের শিল্প উৎপাদন সচল থাকছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি আজ আর আগের মতো একপাক্ষিক ক্ষমতার প্রদর্শন নয়।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এশিয়া। একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো আটলান্টিকের দুই তীর থেকে। এখন সেই চিত্র বদলাচ্ছে। বিশ্বের প্রবৃদ্ধির বড় অংশ আসছে এশিয়া থেকে, জ্বালানির বড় বাজার এশিয়ায়, উৎপাদনের বৃহত্তম কেন্দ্রও এশিয়া। ফলে ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস কিংবা মস্কোকে এখন এশিয়ার বাস্তবতা বিবেচনায় নিতেই হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় বার্তা লুকিয়ে আছে। আমাদের অর্থনীতি রপ্তানিনির্ভর। আমাদের শিল্প উৎপাদন আমদানি করা জ্বালানি, কাঁচামাল ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো ভুল হিসাব কিংবা বড় শক্তিগুলোর সংঘাতের মূল্য শেষ পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোকেই বেশি দিতে হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, পরিবহন খরচ বাড়ে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে। আবার বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা দেখা দিলে আমাদের রপ্তানি খাতও সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ কারণে বাংলাদেশের স্বার্থ কখনোই কোনো একক শক্তি বা ব্লকের সঙ্গে নিজেকে বেঁধে ফেলার মধ্যে নেই। আমাদের স্বার্থ রয়েছে ভারসাম্যে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ও অবকাঠামো অংশীদার। ভারত আমাদের বৃহত্তম প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের জ্বালানি এবং প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস। এই বাস্তবতায় কূটনৈতিক ভারসাম্য বাংলাদেশের জন্য কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি জাতীয় প্রয়োজন।
আজকের বিশ্বে বন্ধুত্বের চেয়ে স্বার্থ বেশি স্থায়ী। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন সত্য হলো, কোনো রাষ্ট্র স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়; স্থায়ী হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত সেই পুরোনো সত্যকেই নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দিল। যে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়াকে চাপে রাখতে কঠোর আইন পাস করেছিল, সেই যুক্তরাষ্ট্রই পরে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে তার প্রয়োগ স্থগিত করেছে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আদর্শ নয়, স্বার্থ।
বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এখানে শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আগামী দিনের বিশ্ব হবে আরও প্রতিযোগিতামূলক, আরও অনিশ্চিত এবং আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের কূটনীতি হতে হবে আরও পরিণত, অর্থনীতি হতে হবে আরও বৈচিত্র্যময় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা হতে হবে আরও শক্তিশালী। শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত আসলে একটি বড় সত্যকে সামনে এনেছে। বিশ্ব রাজনীতির দাবার বোর্ডে শক্তির লড়াই যতই তীব্র হোক, শেষ চালটি অনেক সময় দেয় অর্থনীতি। আর যে দেশ সেই বাস্তবতা সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্ব ব্যবস্থায় তার অবস্থানই হবে সবচেয়ে শক্তিশালী। বাংলাদেশেরও এখন সেই বাস্তবতার ভাষা বুঝে এগিয়ে যাওয়ার সময়।
লেখক: সহিদুল আলম স্বপন; জেনেভাভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক, প্রাইভেট ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম কমপ্লায়েন্স বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক আর্থিক স্বচ্ছতা ও কৌশলগত বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখেন।
ই-মেইল: [email protected]
