সংবাদ · আন্তর্জাতিক
বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন?
২১/১০/২০২৬

মৃত্যুদণ্ড
কার্যকরের আগের দিনও বাংলাদেশে নিজের পরিবারের সাথে ফোনে স্বাভাবিক কথা বলেছিলেন প্রবাসী
নজরুল ইসলাম। কিন্তু তার ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে অত্যন্ত
গোপনে নজরুল ইসলাম এবং সুইটি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি প্রবাসীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর
করে সৌদি কর্তৃপক্ষ। পবিত্র মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কাজের’ অভিযোগে তাদের এই সর্বোচ্চ
সাজা দেওয়া হলেও, এই বিচার ও সাজা কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক আইন, ভিয়েনা
কনভেনশন এবং ন্যূনতম কূটনৈতিক শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক আইন
বিশেষজ্ঞরা। একই সাথে, সৌদি আরবের পাঠানো বন্দি তালিকায় এই সাজার তথ্য গোপন রাখার বিষয়টি
দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে অসংগতি ও ধোঁয়াশা তৈরি করেছে।সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে নজরুল ও সুইটিকে ‘ওমরাহ করতে যাওয়া নবদম্পতি’ হিসেবে
প্রচার করা হলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে, তারা
দুজনেই সৌদি আরবের 'আল মাজাল' (Al Majal) নামক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী
হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং কর্মসূত্রে একে অপরকে চিনতেন। নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার
সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামে এবং সুইটির বাড়ি টাঙ্গাইলে। নজরুলের পরিবার স্পষ্ট জানিয়েছে,
নজরুল অবিবাহিত ছিলেন এবং সুইটির সাথে তার পারিবারিক বা বৈবাহিক কোনো সম্পর্ক ছিল না।জেদ্দা
বাংলাদেশ কনস্যুলেটের সংগৃহীত সৌদি নথির তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার পেছনে বেশ কিছু নিয়মবহির্ভূত
আইনি ও প্রশাসনিক অসংগতি দেখা গেছেসৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে মসজিদে অনৈতিক কাজের কথা বলা হলেও, কনস্যুলার
নথিতে দেখা যায় নজরুলকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সাইবার অপরাধের অভিযোগে এবং সুইটিকে তার
পরদিন অর্থাৎ ২ আগস্ট ব্যভিচারের অভিযোগে পৃথকভাবে আটক করা হয়। দুটি ভিন্ন অভিযোগের
সূত্র ধরে কীভাবে এক অপরাধে সাজা হলো, তা স্পষ্ট নয়।আটকের
পর থেকে তাদের আলাদা স্থানে রাখা হয়েছিল। নজরুল বন্দি ছিলেন জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং
সুইটি আক্তার বন্দি ছিলেন জেদ্দার নারী কারাগারে।দাবি
করা হয়েছে তারা ‘মক্কার একটি মসজিদে যৌথভাবে অনৈতিক কাজ’ করেছেন। কিন্তু শুরুতেই যদি
তারা হাতেনাতে মক্কার মসজিদে একসাথে ধরা পড়তেন, তবে তাদের একই তারিখে, একই অভিযোগে
এবং একই থানার অধীনে একই মামলার আসামি করা হতো। আলাদা তারিখে ভিন্ন অভিযোগে ভিন্ন কারাগারে
রাখার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক তদন্তের সাথে তাদের চূড়ান্ত
রায়ের বর্ণনার মধ্যে মারাত্মক আইনি অসংগতি ছিল। এই
পুরো বিচার প্রক্রিয়াটি বৈশ্বিক কনস্যুলার চুক্তি ও মানবাধিকারের সাধারণ নিয়মকে বাইপাস করা হয়েছে : ভিয়েনা
কনভেনশন ১৯৬৩-এর লঙ্ঘন: জাতিসংঘের
১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশন্স এর ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যেকোনো বিদেশি
নাগরিককে আটক বা সাজা দেওয়ার সময় সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসকে বাধ্যতামূলকভাবে অবহিত
করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আগাম কোনো নোটিশ দেয়নি।তথ্য
গোপনের কূটনৈতিক অসদাচরণ: গত
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জেদ্দা বাংলাদেশ কনস্যুলেটকে
আড়াই হাজার বন্দির একটি তালিকা দেয়, যেখানে নজরুল ও সুইটির নাম থাকলেও তাদের যে মৃত্যুদণ্ডের
সাজা হয়েছে সেই তথ্যটি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়। ফলে বাংলাদেশ হাইকমিশন তাদের কোনো আইনি
সুরক্ষার সুযোগ পায়নি।আত্মপক্ষ
সমর্থনের অধিকার খর্ব: মানবাধিকারের বৈশ্বিক নিয়মানুযায়ী
(Universal Declaration of Human Rights - Article 10), যেকোনো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত
ব্যক্তির আইনি সহায়তা বা উকিল পাওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু নজরুল বা সুইটি কাউকেই
কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।পরবর্তী
পদক্ষেপ কি হতে পারে: আকস্মিক
এই মৃত্যুর খবর শুনে দুই প্রবাসীর পরিবারই বর্তমানে শোকে স্তব্ধ। কোনো আইনি লড়াই বা
আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই অতি গোপনে এই সাজা কার্যকর করায় পরিবারগুলো তীব্র
ক্ষোভ ও বিচারহীনতার অভিযোগ তুলেছে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে
ডেকে বৈঠক করেছে এবং রায়ের আনুষ্ঠানিক কপি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। একই সাথে, আন্তর্জাতিক
নিয়ম ভঙ্গ করার কারণে সৌদি আরবের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করা হয়েছে।ব্যভিচার বা তথ্যপ্রযুক্তি
আইন লঙ্ঘনের দায়ে সৌদি আরবের আইনি ইতিহাসে এর আগে কোনো প্রবাসীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার
নজির নেই। সৌদি বিচারক শরিয়াহ আইনের অধীনে তাআজির (বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তি) বিধানের
আওতায় অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে এই সর্বোচ্চ ও বিরল সাজা দেন।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗