মোজাম্বিকে ছিলেন প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর। প্রবাস থেকে ফিরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুঁইছড়ি প্রেমবাজারে শুরু করেছিলেন হার্ডওয়্যারের ব্যবসা।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে আটটার দিকে নিজের দোকান মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজে বসে ছিলেন মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান। হঠাৎ কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট পরা চার ব্যক্তি দোকানে ঢোকেন। মাথায় ক্যাপ, মুখে মাস্ক। নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে বলেন, তার নামে মামলা আছে, তাঁদের সঙ্গে যেতে হবে।
এরপর হাসানের দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তাকে দোকান থেকে বের করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলা হয়। কয়েক দফায় যানবাহন বদলে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কক্সবাজারের দিকে। অপহরণের কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।
হাসানের চোখ ও হাত বেঁধে একাধিক স্থানে আটকে রাখা হয়। তার অভিযোগ, মারধর ও দুর্ব্যবহারের পাশাপাশি ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হয়নি। প্রায় চার দিন পর বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর চারটার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকা থেকে তাঁকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ।
এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সিসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, ‘এসআরবি’ লেখা পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজ ধরে অভিযান
পুলিশ জানায়, অপহরণের পর হাসানের ভাই মো. হোছাইমের করা এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। মুক্তিপণের ফোনগুলো ভিওআইপি নম্বর থেকে আসায় শুরুতে অপহরণকারীদের শনাক্ত করা কঠিন ছিল। পরে প্রেমবাজার থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও স্থানীয় সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেয় পুলিশ।
এর ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫-সংলগ্ন এলাকা থেকে হাসানকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য, ক্যাম্পের ভেতরে অভিযান ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দিয়ে সেখানে থাকা সহযোগীদের ফোন করানো হয়। মুক্তিপণের টাকা পাওয়া গেছে এবং হাসানকে ফেরত দিতে হবে—এমন কথা বলে তাকে ক্যাম্পের বাইরে আনা হলে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, গ্রেপ্তার সুমন মুন্সি আগে র্যাবে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, সুমন ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করতেন। চক্রের সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা ও চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ করে তাকে জানাতেন। বাঁশখালীর আব্বাস উদ্দিন স্থানীয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয় করতেন। আর গ্রেপ্তার ছলিম ওরফে সেলিম টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা হওয়ায় ক্যাম্পের ভেতরে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করতেন বলে পুলিশের ধারণা।
গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তিরা হলেন মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন। পুলিশ জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি, ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।
‘পাঁচ দিনে একবার খাবার দিয়েছে’
উদ্ধারের পর হাসান বলেন, অপহরণকারীরা তাকে কয়েকটি স্থানে আটকে রেখে মারধর করেন। চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় তাকে রাখা হয়েছিল। তার ভাষ্য, প্রায় পাঁচ দিনের মধ্যে মাত্র একবার খাবার দেওয়া হয়। উদ্ধারের সময়ও তার চোখ বাঁধা ছিল। পুলিশ নিজেদের পরিচয় দেওয়ার পর তিনি স্বস্তি পান।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ কাউকে নিয়ে যেতে চাইলে আগে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আশপাশের লোকজনের সহায়তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। হাসানকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করাকে অভিযানের বড় সাফল্য বলে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার।
এসএন/
