দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম
নারায়ণগঞ্জ শহরের উকিলপাড়া এলাকার ‘জগৎবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার’ লাড্ডুর সুনাম যেন দেশজুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়; আশপাশের জেলা থেকে মানুষজন এসে লাড্ডু কিনে থাকেন। বাঙালি হিন্দু স¤প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই মানুষজন দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে লাড্ডু কিনেছেন। সেই সাথে হিন্দু স¤প্রদায়ের পাশাপাশি অন্য ধর্মের লোকজনও এসে এই লাড্ডু কিনছেন।
সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে শহরের ৮১ নম্বর বঙ্গবন্ধু সড়কের উকিলপাড়া এলাকায় মতিউল হকের টিনের দোকান ভাড়া নিয়ে ‘জগৎবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার’ চালু করেন সোনাতন ঘোষ। সোনাতন ঘোষ নিজে মিষ্টি তৈরির কারিগর ছিলেন। শুরুতে আগুনে ছেঁকা আটার রুটি, পরোটা, ভাজি, হালুয়া ও বুটের ডাল এবং মিষ্টির মধ্যে লাল মোহন, রসগোল্লা, কালোজাম ও চমচম বিক্রি করতেন তিনি। সেই সময় তাঁর দোকানের মিষ্টির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।
সোনাতন ঘোষকে সবাই ‘সোনাই ঘোষ’ নামে ডাকতেন। সেই থেকে তার নামের সাথে মিলিয়ে জগৎবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারকে সোনাই ঘোষের মিষ্টির দোকান হিসেবে চিনে থাকে। ১৯৯৬ সালে সোনাই ঘোষের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র ছেলে সুখদেব ঘোষ ব্যবসার হাল ধরেন। পরবর্তীতে পরোটা-ভাজি বিক্রি বন্ধ করে দিয়ে শুধু দই-মিষ্টির ব্যবসা ধরে রাখেন। একই সাথে সাথে পূজার সময়ে লাড্ডু বিক্রি করে থাকেন। পূজার সময় ছাড়া লাড্ডু বিক্রি করা হয় না।
এবারের শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন দুই পদের লাড্ডু মিলিয়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ মণ লাড্ডু বিক্রি করা হয়েছে। এক পদের লাড্ডু তৈরি হয় সরের ঘি দিয়ে যেটা কেজি প্রতি ৭০০ টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে। আরেক পদের লাড্ডু তৈরি হয় মাখনের ঘি দিয়ে সেটা কেজি প্রতি ৫০০ টাকা করে বিক্রি করা হয়েছে।
লাড্ডু ছাড়াও কেজিপ্রতি লাল মোহন, ক্ষীরের চপ ও ছানার আমিতি ৪০০ টাকা; রসগোল্লা, কালোজাম ও চমচম ৪০০ টাকা; মালাইকারি ও ক্ষীর তোয়া ৫৫০ টাকা; ক্ষীর মাদ্রাজ ৭৫০ টাকা, কাঁচা গোল্লা ও সন্দেশ ৮৫০ টাকায় বিক্রি হয়। এক কেজি ওজনের দই ৩০০ টাকা এবং দুই কেজি ওজনের দই ৫৫০ টাকায় বিক্রি করা হয়ে থাকে।
তন্বী সাহা নামে একজন নারী বলেন, লাড্ডু আমাদের পূজার অংশ। লাড্ডু দিয়ে আমাদের দেবতাদের মিষ্টিমুখ করিয়ে থাকি। সেই সাথে মেহমানদের আপ্যায়ন করে থাকি। এখানে সকালে না আসলে লাড্ডু পাওয়া যায় না। তাই সকালে এসে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় দাঁড়িয়ে থেকে লাড্ডু কিনেছি। অন্য সকল মিষ্টি দোকানের চেয়ে এই দোকানের লাড্ডু অন্যতম।
জীবন সাহা বলেন, সকালে এসেছিলাম লাড্ডু কেনার জন্য। প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে লাড্ডু কিনেছি। এই জগৎবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারের লাড্ডু অন্য সকল দোকানের চেয়ে ব্যতিক্রম। এগুলোর মান অনেক ভালো। যার কারণে অনেক্ষণ সময় দাঁড়িয়ে থেকে হলেও এই লাড্ডু কিনেছি। এই লাড্ডু আমাদের পূজার একটা অংশ। পূজার জন্য এই লাড্ডু ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
তিনি আরও বলেন, এই লাড্ডু কেনার ক্ষেত্রে কোনো ধর্ম বর্ণ নেই। পূজার সময়ে সকল ধর্মের লোকজনই এই লাড্ডু কিনে থাকেন। এখন এটা আমাদের বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে পরিণত হয়েছে। এসময়ে লাড্ডু না কিনলে মনে অপূর্ণ থেকে যায়।
তপন রায় নামে একজন বলেন, এই লাড্ডু শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়; অন্য জেলা থেকেও লোকজন এসে লাড্ডু কিনে থাকেন। দেশব্যাপীই এই দোকানের সুনাম রয়েছে। তাদের দোকানের লাড্ডুর অনেক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু তারা মান ধরে রাখার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণে লাড্ডু বিক্রি করে থাকে।
জগৎবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডারের বর্তমান মালিক সুখদেব ঘোষ বলেন, বাবা এই দোকান চালু করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর আমি এই ব্যবসার হাল ধরেছি। বাবা যে সুনাম অর্জন করেছিলেন সেই সুনাম ধরে রেখেই মিষ্টি বিক্রি করে আসছি। পূজার সময় এই লাড্ডু বিক্রি করে থাকি। আমার এখানে লাড্ডু চাহিদা অনেক বেশি। কিন্তু মান ধরে রাখার জন্য পরিমাণে কম বিক্রি করে থাকি। আমরা লাড্ডু তৈরি করি ঘি দিয়ে। আরও কিছু বিষয় আছে। আমরা চেষ্টা করে থাকি যারা এই লাড্ডু খাবে তারা যেন পরিপূর্ণ স্বাদ পেয়ে থাকে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি প্রদীপ কুমার দাস বলেন, নারায়ণগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান হলো জগৎবন্ধু মিষ্টান্ন ভান্ডার। তারা কয়েক যুগ আগে থেকে সুনামের সাথে মিষ্টি বিক্রি করে আসছে। যার কারণে তাদের দোকানের লাড্ডু অন্য সকল দোকানের চেয়ে আলাদা। সেই সাথে সকলেই তাদের দোকান থেকে লাড্ডু ক্রয় করার জন্য ভীড় করে থাকেন।
তিনি আরও বলেন, লাড্ডু পূজার জন্য ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে এই লাড্ডু বাঙালির ঐতিহ্য হয়ে গেছে। হিন্দু ধর্মালম্বীদের পাশাপাশি অন্য ধর্মালম্বীরাও এই লাড্ডু কিনে থাকেন। পূজার সময় আসলে মনে হয় লাড্ডু ছাড়া চলে না। আমরা আমাদের এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে চাই।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ জেলার সহকারী পরিচালক হৃদয় রঞ্জন বনিক বলেন, আমাদের নিয়মিত বাজার তদারকি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কেউ পণ্য কিনে প্রতারিত হলে, আমাদের কাছে অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।
